বিএনপি দেশের রাজনীতিকে অপরাধ জগতে নিয়ে গেছে : শেখ হাসিনা

730

ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ (বাসস) : আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের পরিবারের সদস্য, জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং হত্যা ও দুর্নীতির মামলায় সাজা প্রাপ্তদের মনোনয়ন দেয়ায় বিএনপি’র কঠোর সমালোচনা করেছেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা আজকে দেশের রাজনীতিটাকে অপরাধ জগতে নিয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য একটি রাজনৈতিক দল যত রকমের অপরাধের সাথে যুক্ত। কেউ পাকিস্তানী হানাদারবাহিনীর দোসর কেউ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বা তাদের পরিবারের সদস্য, ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার আসামী-তাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছে।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে যারা এ ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ করেছে তাদের নির্বাচিত করে তারা দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
তিনি বলেন, আমেরিকার কংগ্রেস থেকে একটি তালিকা পাঠিয়েছে সেখানেও জঙ্গিবাদী হিসেবে এদের নাম রয়েছে এবং ইতোমধ্যেই কানাডার আদালত বিএনপিকে একটি জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।
‘এরা যদি নির্বাচিত হয়ে দেশের ক্ষমতায় আসে তাহলে সেই দেশের অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে, মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা কিভাবে থাকবে,এদেশে শান্তি কিভাবে থাকবে, অগ্রগতি কিভাবে হবে, কোনদিনও হবে না,’ যোগ করেন তিনি।
শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ফার্মগেটস্থ বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাংলাদেশ আওয়ামী এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা সভায় সভাপতিত্ব করেন।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, দলের যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল এবং আফম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পরভীন জাহান কল্পনা সভায় বক্তৃতা করেন।
শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা.আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা.নুজহাত চৌধুরী এবং শহিদ শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সারও বক্তৃতা করেন। সভা পরিচালনা করেন দলের উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ওয়াদা ছিল জাতির কাছে ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো। সে অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল করে ’৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করি এবং অনেকের বিচারের রায় ও কার্যকর হয়েছে।
তিনি বলেন, কিন্তুঅত্যন্ত দুঃখের বিষয় আজকে আমরা দেখি যারা এই মানবাধিকারবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত তাদেরই পরিবারবর্গকে, আপনজনকে নিয়ে বিএনপিসহ জোট করা হয়েছে। সেই জোটে অনেকেই এখন আছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় দলত্যাগ করে এবং আদর্শ বিচ্যুত হয়ে গুটিকতক নেতৃবৃন্দের ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচনের সমালোচনা করে বলেন, ‘তাদের কাছে আমার প্রশ্ন যারা এতবড় অপরাধ করলো যে পাকিস্তানী বাহিনীকে আমরা পরাজিত করলাম তাদেরই দোসরদেরকে ধানের শীষ দেয়া হলো। আর যারা একদা আমাদের সাথে ছিল আজকে চলে গেছে তারা কিভাবে নির্বাচন করবে। আর কিভাবেই বা নির্বাচন করে।’
‘এ প্রশ্নের উত্তর তারা জাতির কাছে দিতে পারবে কিনা আমি জানিনা,’যোগ করেন তিনি।
শেখ হাসিনা দেশবাসীর কাছে এসব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী, তাদের দোসর এবং জঙ্গিবাদ এবং হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্তদের প্রত্যাখ্যান করারও উদাত্ত আহবান জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে বলবো অপরাধীদেরকে ভোট দেবেন না, এই অপরাধীরা বাংলাদেশে যেন আর কখনও নির্বাচনে প্রতিনিধি হয়ে আসতে না পারে । যে সব এলাকায় তারা দাঁড়িয়েছে (নির্বাচনে) তাদেরকে চিহ্নিত করুন এবং তাদেরকে একেবারে বয়কট করে দিন। ’
এরা ক্ষমতায় আসলে এদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এদেশের
দেশের অগ্রগতি ব্যহত হবে, এদেশের ভাগ্য গড়ার জন্য আজকে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নটা হচ্ছে সেটাও থেমে যাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসই মুছে ফেলতে চেয়েছিল, ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন যে সংগঠনের মাধ্যমে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছে সেই দল আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় এসেছে তখনই দেশের উন্নয়ন হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ২০১৪-১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, জনগণ যখন প্রতিহত করেছে তখনই তারা থামতে বাধ্য হয়েছে। সেই খালেদা জিয়া আজ এতিমের অর্থ আত্মস্যাতের অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত। এটা কোন রাজনৈতিক গ্রেফতার ছিল না।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক গ্রেফতার যদি করতে হতো তাহলে ১৪ তেও করা যেতো আবার ২০১৫ সালেও করা যেতো। তখন তিনি তাঁর অফিস নামক বাড়ির মধ্যে ৬২ জন মানুষ নিয়ে ৯২ দিন নিজেই অবরুদ্ধ ছিলেন, আর হুকুম দিয়ে মানুষ পুড়য়ে হত্যা করেছেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যাদের অপরাধ আজকে প্রমাণিত তাদের সাথে ড. কামাল হোসেন, মান্না, সুলতান মোহম্মদ মনসুর আমাদের কাদের সিদ্দিকীসহ যারা একসময় নীতির কথা শোনাত তারা কিভাবে হাত মেলালেন সেটাই আমার প্রশ্ন।
তিনি বলেন, আমি চেয়েছিলাম একটি শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যদিয়ে এদেশের নির্বাচনটা হোক, জনগণের অধিকার নির্বাচনে ভোট দেয়া, সেটা তারা যথাযথভাবে প্রয়োগ করুক, সেই শান্তিপূর্ণ অবস্থা যাতে দেশে থাকে এজন্য তাদের সাথে আমি দুই দুইবার সংলাপ করলাম। কিন্তু নির্বাচনে এসে দেখলাম অপরাধী এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন ও দুর্নীতিবাজদের। নির্বাচনে এরা প্রতিনিধি হবে সেটা জাতি আশা করে নাই।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দেশে ’৭৫ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের পুণর্বাসনে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরে বলেন.সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদের একটি অংশ এবং ৩৮ অনুচ্ছেদের অর্ধেক ‘মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাতিল করে দিয়ে জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের ভোটের অধিকার দেয়, রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেয় এবং পুরো সংবিধানকে অকার্যকর করে ফেলে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া যাদেরকে মন্ত্রী বানিয়েছিল তারাও যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত। যারা আজকে এদের সাথে হাত মিলিয়েছে তারাইবা এ লজ্জাটা কোথায় রাখবে?
প্রধানমন্ত্রী এ সময় বিএনপি’র মননয়ন লাভকারীদের মধ্যকার অপরাধীদের খতিয়ানও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও-২ থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে মওলানা আব্দুল হাকিমকে। সে ছাত্রসংঘের (পরবর্তীতে ইসলামী শিবির) এবং আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিল এবং পকিস্তানী বাহিনীকে পথ-ঘাট চিনিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজগুলো এরাই করেছে।
পাবনা-১ আসনে দেয়া হয়েছে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নজিবুর রহমানকে। এই নিজামীর ফাঁসি হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে। যার বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে সব থেকে বেশি সম্পৃক্ততা ছিল।
কক্সবাজার-২ আসনে যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতা এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সেও একজন যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতা বিরোধী অপরাধী।
পিরোজপুর-১ আসনে যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজা প্রাপ্ত দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে শামীম বিন সাঈদীকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
বগুড়া-৩ আসনে বগুড়া অঞ্চলে ’৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত এবং পলাতক মোমিন তালুকদারের স্ত্রী মাসুদা মোমেন তালুকদারকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
খুলনা-৫ এ যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা এবং ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনে অংশ নেয়া মিয়া গোলাম পারওয়ারকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরায় যুদ্ধাপরাধী গাজী নজরুল ইসলাম, চট্টগাম-৪ আসন থেকে ইসহাক চৌধুরী, যার ভাই আসলাম চৌধুরী ভারতে বসে ইসরাইলী গোয়েন্দা মোসাদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল।
রংপুর-৩ আসনে জাতীয় চারনেতা হত্যা মামলার আসামী মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানের স্ত্রী রিটা রহমানকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।
নেত্রকোনা-৪ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামী লুৎফুজ্জামান বাবরের স্ত্রী তাহমিনা জামানকে।
কুমিল্লা-৬ আসনে মনোনয়ন পেয়েছে ড. মোশাররফ হোসেন, যার কন্ঠস্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সাথে সে যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা ভাইয়ের কথা দেশবাসী এখনও ভুলে যায়নি। সেই বাংলা ভাইকে যারা সৃষ্টি করেছিল, মদদ দিয়েছিল তাদের মোটামুটি সবাই এখন নমিনেশন পেয়ে গেছে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন- রাজশাহী-১ থেকে ব্যারিস্টার আমিনুল হক, বাংলা ভাই এবং জঙ্গিবাদ সৃষ্টিতে তাঁর হাত আছে। রাজশাহী-২ আসনের মিজানুর রহমান মিনু, তারও হাত আছে। মহিমা এবং ৬ বছরের শিশু রাজুফাকে গণধর্ষণের সঙ্গেও তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। এছাড়া রুহুল কুদ্দুস তালুকদার নাটোর-২, নাদিম মোস্তফা, নওগাঁ-৬ এর প্রার্থী আলমগীর কবির এদের সবার সঙ্গে জঙ্গিবাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এরমধ্যে ব্যারিস্টার আমিনুল হক মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আমেরিকার এফবিআই’র হাতে ধরাও পড়েছে।
তারা টাঙ্গাইল-২তে যাকে মনোনয়ন দিয়েছে সে হচ্ছে সেই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু,২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামী খালেদা জিয়ার ক্যাবিনেটের মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই।
শেখ হাসিনা বলেন, এভাবে জামাতের ২২ জন এবং তাদের দলে যারা যারা অপরাধী বা অপরাধীর পরিবার তারাই মনোনয়ন পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর বিরুদ্ধেও এসব ষড়যন্ত্রকারী মিগ টুয়েন্টি নাইন কিনে দুর্নীতির অভিযোগ করলেও তা প্রমানে ব্যর্থ হয় উল্লেখ করে বলেন, ‘বিশ্ব ব্যাংকও পদ্মা সেতু নিয়ে আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, তারা রাজনীতিটাকে কোথায় নামিয়েছে। মূলত এটা একটা অপরাধী জগতের রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ যে রাজনীতি হবার কথা ছিল দেশের মানুষের কল্যাণে, মানুষের মঙ্গলের জন্য। উন্নয়নের জন্য আজকে যদি সেখানে অপরাধীরাই ক্ষমতায় এসে যায় তাহলে সেদেশের ভাগ্যে কি ঘটবে সেটাই আমার প্রশ্ন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি দেশবাসীকে আহবান জানাবো- আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি। এজন্য আমাদের দেশের জনগণ এবং বহু নেতা-কর্মী জীবন দিয়েছেন।
তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জীবনের বহু বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। বহু ত্যাগের বিনিময়ে আমরা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে এনেছি। এই অর্জনকে আমাদের ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।