বাসস ইউনিসেফ ফিচার-১ : তথ্য প্রযুক্তি ভুবনে নারীর পদচারণা বাড়ছে

305

বাসস ইউনিসেফ ফিচার-১
তথ্য প্রযুক্তি ভুবনে নারীর পদচারণা বাড়ছে
ঢাকা, ২ ডিসেম্বর, ২০১৮ (বাসস) : মোনা ইসলাম সদ্য এইচএসসি পাশ করেছেন। পেয়েছেন সব বিষয়ে জিপিএ ফাইভ। এইচএসসির পর কোন বিষয় নিয়ে পড়বেন তা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না তার। শুধু ইচ্ছে ছিল বুয়েটে ভর্তির সুযোগ পেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার। রেজাল্টের পর তার পছন্দের গণিত স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনিই মোনাকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ার পরামর্শ দেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “খুব বেশি মেয়ে সাধারণত এ বিষয়ে পড়তে চায় না। কিন্তু বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটালের যুগে এ বিষয়ের চাহিদা অনেক।”
স্যারের কথা মনে ধরে গেল মোনার। সিদ্ধান্ত নিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়েই পড়বেন। ভর্তিপরীক্ষায় টিকেও গেলেন তিনি।
রাইদা রহমান মার্কেটিং বিষয়ে বিবিএ ও এমবিএ করার পর স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসারেই ব্যস্ত ছিলেন অনেক দিন। কিন্তু কিছু না করে ঘরে বসে থাকার বিষয়টি তার কখনও ভালো লাগেনি। সন্তানরা বড় হওয়ার পর তিনি কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাতে সংসারে বাড়তি কিছু আয়ও হবে।
রাইদা এবার যোগাযোগ করেন তার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু রায়হানের সঙ্গে। বন্ধুটি পরামর্শ দেন কম্পিউটার বিষয়ে স্বল্পমেয়াদী একটি কোর্স করে আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত হবার। বন্ধুর পরামর্শমতো চার মাসের একটি কোর্সে ভর্তি হন রাইদা। কোর্সশেষে বাসায় বসেই শুরু করেন আউটসোর্সিংয়ের কাজ। শুরুর দিকে কাজ কম থাকলেও এখন অবসর মেলার ফুরসত নেই। মাসে তার গড় আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকায়।
বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের (বিওএসএন) তথ্যমতে, দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়সহ নব্বইটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার সায়েন্স অথবা তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে পড়ুয়াদের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী। ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালানো জরিপে এ তথ্য পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ২৫ শতাংশের মধ্যে ১৩ শতাংশ লেখাপড়া শেষ করে আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিতে যুক্ত হন। তবে এদের মাত্র এক শতাংশ আইসিটি-সংক্রান্ত কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন।
বিওএসএন জানাচ্ছে যে, ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত আইসিপিসি ঢাকা রাউন্ডের প্রাথমিক বাছাই পর্বে অংশ নেওয়া ৯৭৯টি টিমের মধ্যে মাত্র পাঁচটি টিমে নারীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন।
জরিপ শেষে বিওএসএন নারীদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক প্রচারণা চালায়। এর ফলে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ওই প্রতিযোগিতায় ১২৯টি টিমে নারীরা অংশ নেন।
বিওএসএন-এর সাধারণ সম্পাদক মুনীর হাসান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল মেয়েদের আরও বেশি করে আইসিটি সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত করা। এ লক্ষ্যে আমরা দুটি প্রজেক্ট হাতে নিই– ‘গার্লস ইন আইসিটি’ এবং ‘মিসিং ডটার’। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিতে মেয়ের অংশগ্রহণের হার বাড়ানোর পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে তারা যেন তাদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারেন সেটাও আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এসব সেক্টরে মেয়েদের অংশগ্রহণ এখনও আশানুরূপ নয়।”
তিনি জানান, লক্ষ্য পূরণের জন্য বিওএসএন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছে।
ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ১.২ মিলিয়ন চাকরির সুযোগ তৈরি হয়। এসব চাকরির অধিকাংশই ছেলেদের দখলে চলে যায়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট জানিয়েছে যে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে, চাকরির বাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বর্তমানের চেয়ে আরও বেশি হতে হবে। নারীদের অংশগ্রহণের হার যদি ৩৩.৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮২ শতাংশ করা যায় তবে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ১.৬ শতাংশ বেড়ে যাবে।
বর্তমান সরকারও আইসিটি সেক্টরে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এ সেক্টরে দশ হাজারেরও বেশি দক্ষ নারী জনবল গড়ে তুলতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় ‘লিভার্জিং আইসিটি ফর গ্রোথ’, ‘এমপ্লয়মেন্ট এন্ড গভর্নেন্স’ (এলআইসিটি) নামের একটি প্রজেক্ট শুরু হয়েছে। এর অধীনে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
প্রজেক্টটি মূলত পরিচালিত হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ডিভিশনের অধীনে এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) উদ্যোগে। এটি চালু হয় গত বছর। এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার নারী-পুরুষকে আইসিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রশিক্ষিত ১০ হাজার নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করা হবে।
বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ রহমান জানালেন, “অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি নারীর জন্য কর্মক্ষেত্র হিসেবে অনেক বেশি উপযোগী। যে নারীরা উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখেন তারা এ সেক্টরে আসতে পারেন। এখানে কাজের অনেক ক্ষেত্র এখনও পড়ে রয়েছে।”
বাসস ইউনিসেফ ফিচার/আরবি/এফওয়াই/১৮৩০/আহো/-এসএইচ