বাসস দেশ-১ : কুমিল্লার মোগলটুলীতে দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক শাহ সুজা মসজিদ

35

বাসস দেশ-১
ইতিহাস-ঐতিহ্য
কুমিল্লার মোগলটুলীতে দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক শাহ সুজা মসজিদ
॥ কামাল আতাতুর্ক মিসেল ॥
কুমিল্লা (দক্ষিণ), ১৮ জুন, ২০২১ (বাসস) : চার’শ বছরের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেলার শাহ সুজা মসজিদ। বাদশাহ আওরঙ্গজেবের ভাই শাহ সুজার নামানুসারে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদ নামকরণ করা হয়েছিল। কুমিল্লার মোগলটুলীতে এর অবস্থান। প্রাচীন এ মসজিদটি দেখতে মোগলটুলী এলাকায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন।
জানা যায়, মসজিদটি মোঘল শাসনামলের। বাংলার ইতিহাসে মোগল অধ্যায়ের একটি উজ্জ্বল নাম ছিল শাহ সুজা। তিনি মোগল স¤্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে। তিনি বাংলার সুবাদার ছিলেন ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ খিস্টাব্দ পর্যন্ত। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মিত হয়। প্রাচীন এ মসজিদটি কুমিল্লা শহরের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ হিসেবে খ্যাত। ইতিহাস ঐতিহ্যে জেলার তথ্য বাতায়নে এই মসজিদের নাম ও ছবি স্থান করে নিয়েছে।
এ মসজিদের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ কৈলাসচন্দ্র সিংহ তার রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, ‘গোমতী নদীর তীরে কুমিল্লা নগরীতে সুজা মসজিদ নামক একটি ইষ্টক নির্মিত বৃহৎ মসজিদ অদ্যাপি দৃষ্ট হয়ে থাকে। এ মসজিদ সম্পর্কে দুই ধরনের জনশ্রুত হওয়া যায়। প্রথমত, সুজা ত্রিপুরা জয় করে বিজয়বৃত্তান্ত চিরস্মরণীয় করার জন্য এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, মহারাজ গোবিন্দ মানিক্য সুজার নাম চিরস্মরণীয় করার জন্য নিমচা তরবারি ও হিরকাঙ্গুরীয়ের বিনিময়ে বহু অর্থ ব্যয় করে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন।
মসজিদটি বাইরের আয়তাকার মাপে দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ৬৮ মিটার, প্রস্থ ৮ দশমিক ৫৩ মিটার। প্রাচীরগুলো ১ দশমিক ৭৫ মিটার পুরু। মসজিদের চার কোণে ৪টি অষ্টকোণাকার বুরুজ রয়েছে। এগুলো কার্নিসের বেশ উপরে উঠে গেছে এবং এর শীর্ষে রয়েছে ছোট গম্বুজ। মসজিদের পূর্ব প্রাচীরে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ প্রাচীরে একটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। প্রধান প্রবেশপথটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং এতে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রবেশ পথগুলোর উভয় পাশে ও উপরে প্যানেল নকশা অলঙ্কৃত। কিবলা প্রাচীরে রয়েছে তিনটি মিহরাব, কেন্দ্রীয়টি অপেক্ষাকৃত বড় ও অধিক আকর্ষণীয়। এটি ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশায় শোভিত। দুইটি পার্শ্ব খিলান দ্বারা মসজিদের অভ্যন্তর তিন ভাগে বিভক্ত। মধ্যের অংশটি বাইরের দিকে পূর্ব ও পশ্চিমে কিছুটা উদ্গত করে নির্মিত। এ অংশের চার কোণে চারটি সরু মিনার কার্নিসের উপরে উঠেছে। অষ্টকোণাকার ড্রামের উপর নির্মিত তিনটি গোলাকার গম্বুজ দ্বারা মসজিদের ছাদ ঢাকা। মধ্যেরটি অপেক্ষাকৃত বড়। গম্বুজগুলোর শীর্ষদেশ পদ্মনকশা ও কলস চূড়া দ্বারা শোভিত। মসজিদের কার্নিসের নিচের অংশ মারলোন নকশায় অলঙ্কৃত।
বিভিন্ন সময়ে মসজিদটির সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একটি শিলালিপির পাঠ অনুযায়ী ১৮৮২ সালে হাজী ইমামউদ্দিন ৭ দশমিক ৩২ মিটার প্রস্থের সমতল ছাদবিশিষ্ট বারান্দাটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে মসজিদটি আরও সম্প্রসারিত ও দুই পার্শ্বে মিনার নির্মাণ করা হয়েছে। এ মসজিদের নামকরণ, প্রতিষ্ঠাতার নাম ও প্রতিষ্ঠার তারিখ নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এ মসজিদ যে পাক ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম সে বিষয়ে কারো সন্দেহ নেই। প্রাচীন এ মসজিদটি দেখতে মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। বিশেষ করে জুমা, শবে বরাত, শবে কদরসহ বিশেষ দিনগুলোয় এখানে মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমান।
শাহ সুজা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সফিকুল ইসলাম সিকদার বাসসকে জানান, এটি একটি প্রাচীন মসজিদ। শুধু কুমিল্লায় নয়, সারা দেশের মধ্যে অন্যতম একটি মসজিদ। এখন ১২ শ’র ওপরে মুসল্লি একসাথে নামাজ পড়তে পারেন। আরো বেশি মুসল্লি নামাজ পড়ার বিষয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাসস/এনডি/বি.প্র./সংবাদদাতা/১০৪৩/কেজিএ