সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া স্বরলিকাকে এখন সংসার সামলাতে হচ্ছে

299

ঢাকা, ১৪ জুন, ২০২১ (বাসস) : পরিবারের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে আমাদের দেশে অনেক প্রতিভা এক সময় হারিয়ে যায়। হোক সেটা ক্রীড়াঙ্গন কিংবা অন্য কোন ক্ষেত্র। বাধ্য হয়েই কখনো কখনো তারা হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে। তাদেরই একজন ফুটবলার স্বরলিকা পারভিন। বয়স ভিত্তিক এ নারী ফুটবলারের কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যগে দেশব্যপি স্কুল পর্যায়ে শুরু হয়েছিল বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল নারী ফুটবলার বের করে আনা। ২০১৭ সালে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ড কাপে ‘হ্যাটট্রিক কন্যা’ খ্যাতি পেয়েছিলেন কুরগ্রামের মেয়ে স্বরলিকা পারভিন। জাতীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার নিয়েছিলেন স্বরলিকা। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি সেই স্বরলিকার বিয়ে হয়েছে।, বাল্যবিবাহ। শুধু স্বরলিকা একা নয়, কুড়িগ্রামের বাঁশজানি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল দলের সাত জন কিশোরী ফুটবল মাঠের পরিবর্তে এখন সংসার সামলাচ্ছে। এদের কারোরই এখনো বিয়ের বয়স হয়নি।
কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারি উপজেলার দীঘলটারি দক্ষিণ বাঁশজানি গ্রাম। দেশের আর দশটা গ্রামের মতই চেহারা। ব্যতিক্রম হচ্ছে এটি বিলুপ্ত একটি ছিটমহল। গ্রামের তিন দিকে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ রাজ্যেও কোচবিহারের দিনহাটা সহকুমার সীমানা। বছর তিনেক আগে এই গ্রামেই গঠিত হয়েছিল বাঁশজানি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল দল। দলের খেলোয়ড়ি ২০ জন কিশোরী। দলটি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সরকারী গোল্ডকাপ ফুটবলে অংশ নিয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ধাপ পেরিয়ে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলতে যায়। কোয়ার্টারফাইনালে হ্যাটট্রিক করে দলকে জেতায় অধিনায়ক স্বরলিকা। তবে সেমিফাইনালে হেরে গিয়ে স্থান নির্ধারনী ম্যাচে চট্টগ্রামের বাঁশখালী সরকারী প্রাথমকি বিদ্যালয়কে ৪-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয় বাঁশজানি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ম্যাচেও হ্যাটট্রিক করেন কিশোরী স্বরলিকা। শুধু বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ নয়, এরপর তার নেতৃত্বে আসে আরো সাফল্য। বিলুপ্ত ছিটমহলের সতুস বাংলাদেশীদের প্রথম উপহার আসে যেন স্বরলিকা পারভিনের হাত ধরেই।
স্বরলিকার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বিষন্ন পরিবেশ। ঘরে গিয়ে দেখা যায় টিনের ঘরে আলমারি ও টেবিলে স্বরলিকার পুরস্কারগুলো থরে থরে সাজানো। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নেয়া পুরস্কারটি দেখিয়ে সে বলে,‘ পুরস্কারগুলো সবই আমার প্রিয়। বিন্তু প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নেয়া পুরস্কারের কথা আমি কোন দিন ভুলবনা।’
বিয়ের কথা উঠলেই স্বরলিকা বরেন,‘ সমাজের মানুষ নানা কথা বলে। মেয়েরা ফুটবল খেললে বিয়ে হবেনা এমন কথাও বলে। ভাল পাত্র পাওয়া যাবেনা। আর্থিক অনটনসহ এমন অনেক কারণে বাবা-মা আমার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে ছিল জাতীয় দলে খেলার। এখন আর গেন স্বপ্ন দেখিনা।’
স্বরলিকার বাবা শহিদুল ইসলাম দিন মজুর মানুষ। তার একার আয়ে পাঁচ জনের সংসার চলে। তিনি বলেন,‘ প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বরলিকা পুরস্কার নিছে। ভালো লাগছিলো। কিন্তু এরপর আর কেউ খোঁজ নেয় নাই। আমি চাই আমার মেয়ের মত পরিস্থিতি যেন কারো না হয়। মেয়ে ফুটবল খেলে, এ জন্য মানুষ নানা কথা বলে। ভালো ঘর পাইছি, যৌতুক ছাড়াই মেয়ের বিয়া দিছি।’ তিনি জানালেন স্বরলিকার স্বামী কামরুল ইসলাম পেশায় মোটরসাইকেল মেকানিক। বাড়ি একই উপজেলায়। কামরুল ইসলামও না-বালক। এখন তার বয়স ১৭ বছর। আর স্বরলিকার বয়স ১৬ বছর। নবম শ্রেনীর পর আর লেখাপড়া করতে পারেনি স্বরলিকা।
বাঁশজানি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন স্বররিকা। কার পথেই হাঁটতে হয়েছে দলের আরো ৬ কিশোরীর। এরাও হয়তো হতে পারত বড় ফুটবলার। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই বসতে হয়েছে বিয়ের পিঁড়িতে। এই ছয় কিশোরী হলেন বাঁশজানি হাই স্কুলের নবম শ্রেনীর জয়নব(১৫),দশম শ্রেনীর শাবানা(১৬), অষ্টম শ্রেনীর রতœা(১৫) আঁখি(১৫), শারমিন(১৬), আতিকা(১৬)। এদেও স্বামীদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে।
শাবানার বাবা সাইফুর রহমান অটোরিক্সাচালক। তার কথায় ঝড়ে পড়ে ক্ষোভ। তিনি বলেন,‘এত দূর থেকে মেয়েরা খেলতে গেছিল। কিন্তু যাওয়া-আসা আর থাকা-খাওয়া ছাড়া মেয়েরা কিছুই পায়নি। উল্টো খেলতে গেলে মেয়েদেও পিছনে টাকা খরচ করতে হতো। করোনার আগেও রংপুরে, ঢাকায় খেলে এসেছে। কোন সহযোগিতা পাই নাই। করোনার কারণে স্কুল বন্ধ, আয় কমে গেছে। খরচ বাড়ছে তাই ভালো সম্বন্ধ পেয়ে মেয়ে বিয়ে দিয়ে দিছি।’
করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর তেমনটা নেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান বাঁশজানি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কায়সার আলী। তিনি বলেন,‘ অনেকের বিয়ের বিষয়টি আমি পরে জানতে পেরেছি। বিয়ের সময় জানতে পারলেও আটকানো যেত।’
ভুরুঙ্গামারি উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা দিপক কুমার দেব শর্মা জানালেন কিশোরী ফুটবলারদের বিয়ের বিষয়ে তিনি জানতেন না। কেউ তাকে জানায়নি। জানলে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে পারতেন। তবে বাকি খেলোয়াড়রা জাতে বাল্য বিবাহের শিকার না হয় , সে জন্য তিনি নজর রাখার পাশাপাশি তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।