কুমিল্লার রূপবাবুর জমিদার বাড়িটি অযত্নে-অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে

109

॥ কামাল আতাতুর্ক মিসেল ॥
কুমিল্লা (দক্ষিণ), ৫ জুন, ২০২১, (বাসস): জেলার মুরাদনগর উপজেলার বাংগরায় জমিদার রূপবাবুর বাড়িটি হারিয়ে যাচ্ছে অযত্নে অবহেলায়। অন্তত আড়াই’শ বছর আগে জমিদারী পরিচালনা হতো এ বাড়ি থেকে। বাড়িটি শান্ত সুনিবিড় পরিবেশে অবস্থিত। বাড়িটির চারদিকে লম্বা-লম্বা গাছ। বাড়ির সামনে কাঁচারী ঘর। ঘরের দরজা জানালায় অনিন্দ্য কারুকাজ। উত্তর ভিটায় রয়েছে একটি মন্দির। এটাকে নারায়ণ মন্দির বলা হয়। আর পশ্চিম ভিটায় মূল বাড়িটি। তিনতলা বাড়িটি। বর্তমানে জমিদার বাড়িতে একটি পরিবার বাস করেন।
বাড়ির ভিতরে রয়েছে জমিদারী আমলের চেয়ার টেবিলসহ আরো কিছু আসবাবপত্র। জমিদার রূপবাবুর প্রজা যারা ছিলেন তাদের একজন শ্রী মনোরঞ্জন চন্দ্র নট্ট। বংশ পরম্পরায় তারা জমিদার বাড়িতে ঢোল বাজাতেন। তিনি জমিদার বাড়ির পাশেই থাকেন। জমিদার বাড়ি দেখাশুনা করেন। চাষাবাদ করেই চলে মনোরঞ্জন নট্টদের জীবন। কথা হয় মনোরঞ্জন নট্টের সাথে। মনেরঞ্জন নট্ট বাসসকে বলেন, জমিদার রূপবাবু ব্রিটিশ সরকারের রায় বাহাদুর উপাধিপ্রাপ্ত ছিলেন। তাই তখন প্রজারা রূপবাবুকে প্রেসিডেন্স বলেও সম্বোধন করতেন। জমিদার রূপবাবু তার বাবা উমালোচন মজুমদারের মত প্রজাবৎসল জমিদার ছিলেন। রুপবাবুর বাবা জমিদার উমালোচন মজুমদার ১৮৮৫ সালে বাংগরায় একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ঐতিহ্যবাহী বাংগরা উমালোচন উচ্চ বিদ্যালয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ছিলো। পরে উমালোচন মজুমদারের ছেলে জমিদার রুপবাবু বর্তমান জায়গায় মূল ভবন স্থাপন করেন। বিদ্যালয়টির সামনে রয়েছে সুবিশাল মাঠ। এত বড় খেলার মাঠ সম্ভবত কুমিল্লা জেলার আর কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেই। রূপ বাবুর মায়ের নাম শান্তমনি দেবী। জমিদার বাড়ির দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে একটি দিঘি। নাম দশান্তমনি সাগর। দিঘির পাড়ে শান বাঁধানো ঘাট। বাংগরা বাজারে শান্তমনি দেবীর নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালায় রয়েছে। ১৯০০ সালে এটি স্থাপন করা হয়েছিলো। প্রজারা সেখানে চিকিৎসা নিতেন। দাতব্য চিকিৎসালয়ের নকশাটি অসাধারণ। রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে এখন সেই নকশায় ঝং ধরেছে। ক্ষয়ে পড়ছে পলেস্তরা। বাংগরা বাজারে অগ্রণী ব্যাংকেরও শাখাও রূপবাবুদের জায়গায় অবস্থিত। এছাড়াও জেলা প্রশাসকের ডাক বাংলোর জায়গাওটাও রুপবাবুদের দেয়া। ৯ টি গ্রামজুড়ে ছিলো রুপবাবুদের জমিদারী।
জমিদার রুপবাবুর এক ছেলে। মানিক বাবু। মানিক বাবুর তিন ছেলে। দেবী প্রসাদ মজমুদার, শিবু প্রসাদ মজুমদার ও শ্যামা প্রসাদ মজুমদার। তাদের মধ্যে শ্যামা প্রসাদ ও দেবী প্রসাদ মজুমদার ঢাকায় থাকেন। কুমিল্লায় পানপট্টির বাংগরা হাউজে থাকেন শিবু প্রসাদ মজুমদার। বিভিন্ন সময়ে তারা বাপ-দাদার ভিটে যান।
রুপবাবুর বাড়ির বর্ণনাকারী শ্রী মনোরঞ্জন চন্দ্র নট্ট জানান, তার বাবা প্রমদ চন্দ্র নট্ট এ জমিদার বাড়িতে ঢোল বাজাতেন। পরে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার ছিলেন। বাবার পথেই আছেন মনোরঞ্জন নট্ট। তিনি এখন গ্রাম পুলিশ হিসেবে কর্মরত। জমিদারীকালে এ বাড়িতে প্রতিদিন অন্তত এক দেড়’শ লোক খাবার আয়োজন হতো। বড় চুলায় রান্না হতো। খাবারের সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো আশেপাশে। জমিদার বাড়িতে যারা কাজ করতেন তারা সবাই এক সাথে বসে খাবার খেতেন।
এ বিষয়ে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বাসসকে বলেন, রূপবাবুর জমিদার বাড়িটির বিষয়ে তিনি খুব শিগগিরই খোঁজখবর নিয়ে বাড়িটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবেন বলে জানান।