সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গ্রহণ

1342

ঢাকা, ২ জুন, ২০২১ (বাসস) : জাতীয় সংসদের কুমিল্লা -৫ আাসনের সদস্য আবদুল মতিন খসরু ও ঢাকা-১৪ আসনের সদস্য আসলামুল হকসহ ১২ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে আজ সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সংসদে এ শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন।এর আগে তার সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিমন্ডলীর মনোনয়ন দেয়া হয়।
শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ গ্রহণ করেন। এছাড়া সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, সরকারি দলের অধ্যাপক আলী আশরাফ, এডভোকেট কামরুল ইসলাম, মুজিবুল হক, এ, কে, এম রহমতুল্লাহ, সাদেক খান, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা, জাসদের হাসানুল হক ইনু এবং বিএনপির হারুনুর রশীদ।
শোক প্রস্তাবে সংসদের ২৫৩ কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে। আবদুল মতিন খসরু ১৯৫০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা জেলার ব্রাক্ষণপাড়া উপজেলার মিরপুর গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৪ এপ্রিল ২০২১ মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
আবদুল মতিন খসরু ১৯৭৬ সনে কুমিল্লা আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কল্যাণ বিষয়ে স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৪ সময়ে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০ সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। আবদুল মতিন খসরু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং কুমিল্লা জেলার অবিভক্ত বুড়িচং থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।আবদুল মতিন খসরু পঞ্চম, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি পঞ্চম জাতীয় সংসদে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। সপ্তম জাতীয় সংসদে সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
আবদুল মতিন খসরু আইনমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৯৬ সালে সংবিধান ও মানবতাবিরোধী কালো আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকান্ডের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সর্বশেষ তিনি গত ১০ ও ১১ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন এবং গত ১২ এপ্রিল অসুস্থ অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদের ১৮৭ ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোঃ আসলামুল হকের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদ থেকে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
মোঃ আসলামুল হক ১৯৬১ সালের ১৪ মে ঢাকা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।
তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং মায়িশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
মোঃ আসলামুল হক নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৮৭ ঢাকা-১৪ আসন হতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
সাবেক সংসদ-সদস্য সারাহ বেগম কবরী, সাবেক সংসদ-সদস্য, মেরাজ উদ্দিন মোলা, সাবেক সংসদ সদস্য গাজী ম. ম. আমজাদ হোসেন মিলন, সাবেক গণপরিষদ সদস্য খোন্দকার আব্দুল মালেক শহীদুল্লাহ, আবুল হাসেম, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান, সাবেক সংসদ-সদস্য মোহাম্মদ ইউনুস, জিয়াউর রহমান খান, আব্দুল বারী সরদার, দিলদার হোসেন সেলিম, আব্দুর রউফ খান এবং ফরিদা রহমানের মৃত্যুতে মহান সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের অফিস সহায়ক যুবরাজ খানের মৃত্যুতে জতীয় সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী, বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মা ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল আবদুল মালেকের স্ত্রী বিশিষ্ট সমাজসেবক ফৌজিয়া মালেক, অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের সহধর্মিনী শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাহিদা আখতার, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাকের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার, বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী মিতা হক, একুশে পদকপ্রাপ্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা, লোকসঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা মুক্তিযোদ্ধা এস এম মহসীন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. একেএম রফিক আহাম্মদ, সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা হারুন-উর-রশিদ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান, চলচ্চিত্র অভিনেতা ওয়াসিম এবং রংপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুর রশিদ বাবুর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া, প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে দেশ-বিদেশে যে সকল ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন-পুলিশের সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যমকর্মীগণ, ব্যবসায়ী ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদ গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে লঞ্চ দুর্ঘটনা ও মাদারীপুরের শিবচর বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের কাঁঠালবাড়ি ঘাটসংলগ্ন এলাকায় স্পিড বোট দুর্ঘটনায় নিহত, জেরুজালেমে মুসলমানদের পবিত্র মসজিদ আল-আকসা প্রাঙ্গণে সম্প্রতি ইসরায়েলের হামলায় নিহত, সাম্প্রতিক ঘুর্ণিঝড় ইয়াসে ভারত ও বাংলাদেশে নিহত ও হতাহত, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় হতাহতদের স্মরণে জাতীয় সংসদ থেকে গভীর শোক প্রকাশ, সকল বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে শোকপ্রস্তাবগুলো সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে গৃহীত হয়।
এরপর মৃত্যুবরণকারী প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন ও তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্ম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান।
এরপর রেওয়াজ অনুযায়ি দিনের অন্যান্য কর্মসূচি স্থগিত করে সংসদের বৈঠক মুলতবি করা হয়।