বাসস দেশ-২ : নাটোরের বাজারে সজিনাতে স্বস্তি

44

বাসস দেশ-২
বাজারে সাজিনা
নাটোরের বাজারে সজিনাতে স্বস্তি
নাটোর, ৫ এপ্রিল, ২০২১ (বাসস) : জেলার সবজি বাজারগুলোতে এখন সজিনার প্রাচুর্য। সজিনার দামও নাগালের মধ্যে। চাল আর তেলের বাজার দরে ক্রেতাদের মধ্যে খানিকটা অস্বস্তি থাকলেও সজিনাতে স্বস্তি। খুচরা বাজারে এখন এককেজি সজিনা ৪০ টাকা। বিষমুক্ত এবং পুষ্টি ও ওষুধি গুনাগুনের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে ক্রেতারা নিয়মিত সজিনা কিনছেন।
শহরের প্রধান কাঁচাবাজার নীচাবাজার ছাড়াও ষ্টেশন বাজার ও মাদ্রাসা বাজারের আড়তসহ খুচরা পর্যায়ে এখন যেন সজিনা বিকিকিনির হাট বসেছে। শহরময় ভ্রাম্যমাণ সবজি ভ্যানেও বিক্রি হচ্ছে সজিনা। ষ্টেশন বাজার এলাকায় কাঁচা সবজির আড়তের আধিক্য। আড়তদার শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান, এখানে ১৪টি আড়তে প্রতিদিন শতাধিক মণের বেশী সজিনা বিক্রি হচ্ছে। নাটোরের গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে আড়তে সজিনা আসছে। নীচাবাজারে রয়েছে দুইটি আড়ত। আড়তদার সাদেকুল ইসলাম বলেন, এ বাজারে আমাদের দুইটি আড়তে প্রতিদিন সজিনার গড় কেনাবেচা পঞ্চাশ মণ। সজিনার বর্তমান আড়ত দর ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা কেজি। নীচাবাজারের খুচরা সবজি ব্যবসায়ী মোঃ কামাল বলেন, এবার সজিনার ব্যাপক সরবরাহ, বিক্রিও হচ্ছে বেশ। প্রতিদিন আমি প্রায় একমণ সজিনা বিক্রি করছি। মৌসুমের শুরুতে যশোর থেকে আসা সজিনা ২০০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন দর ৪০ টাকা কেজি।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, সজিনার পুষ্টিগুন ব্যতিক্রমধর্মী। সজিনা পাতায় ৩৮ রকম অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিডসহ ৩৮ শতাংশ আমিষ রয়েছে। সজিনার পাতা পুষ্টিগুনের আঁধার। পরিমাণের ভিত্তিতে তুলনা করলে একই ওজনের সজিনা পাতায় কমলা লেবুর সাতগুণ ভিটামিন সি, দুধের চারগুণ ক্যালসিয়াম এবং দুইগুণ আমিষ, গাজরের চারগুণ ভিটামিন ‘এ’, কলার তিনগুণ পটাসিয়াম, পালংশাকের তিনগুণ লৌহ বিদ্যমান। পুষ্টি ও ওষুধিী গুন বিবেচনায় এই গাছকে অত্যাশ্চার্য বৃক্ষ বলা হয়। বাড়ির আঙ্গিনায় এটি একটি মাল্টিভিটামিন বৃক্ষ।
ডাঃ মোঃ সাইফুল ইসলাম আরো জানান, ভারতীয় আয়ুর্বেদীয় শাস্ত্র মতে সজিনা গাছ ৩০০ রকমের রোগ প্রতিরোধ করে এবং আধুনিক বিজ্ঞানও এ ধারণাকে সমর্থন করে। সজিনার কচি পড সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সজিনার বাকল, শিকড়, ফুল, ফল, পাতা, বীজ এমনকি এর আঠাতেও ওষুধি গুন আছে। সজিনা বাতজ্বর চিকিৎসায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। পোকার কামড়ে এন্টিসেপটিক হিসেবে সজিনা পাতার রস ব্যবহার হয়। মাথা ব্যথায় সজিনার কচিপাতা কপালের দুই পাশে ঘষলে ব্যথা উপশম হয়। সজিনা গ্যাস্টিক রোগের বায়ুনাশক হিসেবে কাজ করে। পাতার রস হৃদরোগ চিকিৎসায় এবং রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধিতে ব্যবহার হয়। শ্বেতীরোগ, টাইফয়েড জ্বর, প্যারালাইসিস এবং লিভারের রোগে সজিনার রস উপকার। ক্ষতস্থান নিরাময়ের জন্য সজিনা পাতার পেষ্ট কার্যকরি। খাদ্যাভাসে সজিনা গাছের পাতা বা সজিনা থাকলে চোখের ছানি পড়া রোগ কম হয়। সজিনা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে। শ্বাসকষ্ট, মাথাধরা এবং মাইগ্রেন চিকিৎসায় সজিনা ভাল কাজ করে। ভারত, চীন সহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে সজিনা পাতার পাউডার দিয়ে তৈরি ক্যাপসুল বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে। আফ্রিকার দুর্ভিক্ষ পীড়িত অনাহার ও অপুষ্টি শিকার মৃতপ্রায় রোগাক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আরোগ্যের জন্য সজিনার পাতা ও পাতার গোড়া খাওয়ানোর কর্মসূচি চলমান রয়েছে।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় আড়াইশ’ হেক্টর আবাদি এলাকা থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার টন সজিনা উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির ফলে সজিনার আবাদ বাড়ছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বিগত বছরের চেয়ে ফলন অনেকটা বাড়বে। বিগত বছরে ২৩১ হেক্টর আবাদ এলাকা থেকে চার হাজার নয় টন সজিনা উৎপাদন হয়।
নাটোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদুল ইসলাম জানান, গাছে গাছে এখন সজিনার প্রাচুর্য। ঝড়-বৃষ্টিমুক্ত আবহাওয়া থাকায় এবার ফলন হয়েছে আশাতীত। একটি গাছ থেকে দুই মণ পর্যন্ত সজিনা সংগ্রহ করা সম্ভব। বাজারগুলোতে এখন সজিনা প্রধান সবজি হয়ে উঠেছে।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ পরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বাসস’কে বলেন, নাটোরে অত্যাশ্চার্য বৃক্ষ সজিনার আবাদ ও উৎপাদন ক্রমশঃ বাড়ছে। সজিনা চাষ বৃদ্ধি পাওয়াতে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সংগতিও বেড়েছে। করোনা সংক্রমনের এ ক্রান্তিকালে মানুষ বিষমুক্ত এবং পুষ্টি ও ওষুধি গুনে অনন্য সবজি সজিনা নিয়মিত খাবেন এবং উপকৃত হবেন।
বাসস/এনডি/সংবাদদাতা/০৯৫৫/নূসী