বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অদম্য শক্তির ভয়েই হত্যাকারীরা একে মুছে ফেলতে চেয়েছিল

840

ঢাকা, ৬ মার্চ, ২০২১ (বাসস) : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীরা তাঁর ৭ই মার্চের যুগান্তকারী ভাষণের অদম্য শক্তিকে ভয় পেয়েছিল। আর এজন্যই ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর এই ঐতিহাসিক ভাষণকে মুছে দিতে চেয়েছিল। ঐতিহাসিক দিবসটির প্রাক্কালে আজ বাসস-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকালে তিনি এ কথা বলেন।
আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আসলে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ ও তাঁর দর্শণকে ভয় পেত। তাই, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারা এই ভাষণকেও “হত্যা” করতে চেয়েছিল।’ তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত জাতিকে ৭ই মার্চের যুগান্তকারী ভাষণ সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন সরকার গঠন করেন।
অধ্যাপক আরেফিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর শাসন পরবর্তী যুগে, এই ভাষণ ও এই মহান নেতা সম্পর্কে যুবকদের কোন ধারণা ছিল না- যিনি পাকিস্তানী শাসকদের কাছ থেকে এ দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে নেতৃত্ব দেন। ওই সময়ে যারা জন্মেছিল অথবা যারা রেডিও-টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শুনতে বা দেখতে পারত, সেই যুব সমাজকে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুনের আগ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২১ বছর এই ভাষণ সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা হয়।’
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর বোর্ড অব ডাইরেক্টর্সের চেয়ারম্যান প্রফেসর আরেফিন বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পর থেকে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত তাঁর এই যুগান্তকারী অডিও-ভিজুয়াল রেকর্ডটি প্রকাশ বা সম্প্রচার করা হয়নি। তিনি বলেন, ওই সময়ে, শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর জন্ম অথবা শাহাদাত বরণের দিনটিতে এই ভাষণের অডিও রেকর্ড বাজাতেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা গণভবনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পরপরই সন্ধ্যায় রাষ্ট্র পরিচালিত বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সম্প্রচার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ-যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষক প্রফেসর আরেফিন বলেন, টেলিভিশনে রেকর্ডকৃত এই ভাষণটি দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে তাদের অনুভূতির কথা জানিয়েছিলেন। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও তাকে জানান যে- এইসব তরুণরা কখনো ভাবতেও পারেননি যে তাদের এমন একজন মহান নেতা ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তারা এর আগেও হয়তোবা ভাষণের অডিও রেকর্ড শুনতে পারেন, কিন্তু এই প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর নেতৃত্বের বিশালতা, ব্যক্তিত্ব ও সাহস ওই টেলিভিশন সম্প্রচারের মাধ্যমে যুব সমাজের সামনে প্রকাশ পায়।’ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আরেফিন বলেন, প্রথমবারের মতো ভিডিও রেকর্ডটি দেখে, যুবকরা ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, বক্তব্য রাখার ভঙ্গী, শব্দ চয়ন এবং কথা বলার স্টাইল প্রত্যক্ষ করে।
তিনি লক্ষ্য করেন, ‘ওই দিনের আগে ওই সব যুবকেরা এই ভাষণটি দেখার সুযোগ পায়নি। হঠাৎ এই ভাষণ দেখে, তাদের মধ্যে একটি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। প্রফেসর আরেফিন বলেন, এই ভাষণটিকে গোপন করার উদ্দেশ্য ছিল, এর শক্তিকে লুকিয়ে রাখা- যা পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে মুক্তিকামী বাঙালিদের সাহস যুগিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে এই ভাষণটি শুনতেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী কারাগারে বন্দি ছিলেন, কিন্তু তার ভাষণটি আমাদের সাথে ছিল। আর এ জন্যই আমাদের মনে হতো যে- বঙ্গবন্ধু আমাদের সাথে আছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে, বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই ভাষণ শুনেই উজ্জিবীত হতেন।’
আরেফিন সিদ্দিক আরো বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, নতুন প্রজন্মকে বার বার এই ভাষণ শোনাতে হবে। এটিকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে এবং ক্লাসরুমেও এটা পড়াতে হবে। আর এটা যদি করা যায়, তাহলেই এই ভাষণের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব যুব সমাজের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যাবে। এই ভাষণটিই একটি চমৎকার পাঠ্যপুস্তক এবং যুবকদের এ থেকে শিক্ষাদান জরুরি। তিনি বলেন, ইউনেস্কো এটা বুঝতে পেরেছে এবং এ জন্যই এই মহান ভাষণকে মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অর্ন্তর্ভূক্ত করেছে, যা হচ্ছে, জাতিসংঘ সংস্থা কর্তৃক সংরক্ষিত বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী প্রামাণ্যচিত্রের একটি তালিকা।
অধ্যাপক আরেফিন আরো বলেন, ‘মানব সভ্যতা হাজার হাজার বছর পর বর্তমান অবস্থায় এসেছে। এর পেছনে বহু মানুষের অবদান রয়েছে। বঞ্চিত, শোষিত, হতাশ, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে বহু মহান মানবের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর এই অলিখিত ভাষণটিরও একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, ভাষণটির গুরুত্ব ১৯৭১ সালে যেমন ছিল, এই ২০২১ সালেও একই রকম আছে। এমনকি ২০৫০ সালের ৭ মার্চে, যখন বাঙালিরা দিবসটি পালন করবে- তখনও একই থাকবে। তিনি আরো বলেন, ‘যদি আমরা ভাষণটির মনস্তাত্তিক বিশ্লেষণে যাই, তবে আমরা দেখতে পাব যে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় তাঁর মনের কথা এই ভাষণে প্রতিফলিত হয়েছে।’
তাই এটাকে ভাষণ না বলে জনগণের সাথে বঙ্গবন্ধুর কথোপকথনও বলা যেতে পারে- যা তিনি জাতির সামনে কথা বলার মতো করে বলেছিলেন।