বাসস দেশ-৪৬ : গভর্নর হাউসে বিমান হামলা পাক প্রশাসনের পতন নিশ্চিত করেছিল

236

বাসস দেশ-৪৬
বিজয়-পাকিস্তান-পতন-দৃশ্য
গভর্নর হাউসে বিমান হামলা পাক প্রশাসনের পতন নিশ্চিত করেছিল
॥ আনিসুর রহমান ॥
ঢাকা, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০ (বাসস) : ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত রাজধানী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও রেকর্ড থেকে প্রতীয়মান হয় আনুষ্ঠানিক ভাবে শত্রুপক্ষের আত্মসমর্পণের দু’দিন আগে তৎকালীন গভর্নর হাউসে বিমান হামলা নাটকীয় ভাবে পাকিস্তানি প্রশাসনের পতন নিশ্চিত করেছিল।
একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পুরো সকাল জুড়ে গভর্নর ড. মালেক এবং তার আঞ্চলিক মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করা বা না-করা নিয়ে মনস্থির করতে পারেনি। ভারতীয় বিমান হামলা অবশেষে বিষয়টির সুরাহা করে দেয়।’
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গ্লোবাল নিউজ এজেন্সিটি সেদিন তৎকালীন সিভিল প্রশাসনের সর্বোচ্চ কেন্দ্রের এ চিত্র আঁকে যখন ভারতীয় বিমান হামলা কথিত পূর্ব পাকিস্তানের শেষ গভর্নরকে তড়িঘরি করে নিজ পদত্যাপত্র স্বাক্ষরে প্ররোচিত করে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘ভারতীয় মিগ-২১ বিমান যখন গভর্নরের বাসভবন গভর্নর হাউস ধ্বংস করে তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. এম এ মালেক তার অফিসের এক টুকরো কাগজে ‘কাঁপা হাতে’ বলপয়েন্ট কলম দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে তার মন্ত্রিসভার পদত্যাগপত্রের খসড়া লিখেন।’
এই দৃশ্যের সাথে পরিচিত পরাজিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনির সদস্যরাও এ নাটকীয় ঘটনার প্রায় একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন।
তবে বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক গেভিন ডেভিড ইয়াং যিনি তখন গভর্নর হাউজের (বর্তমান বঙ্গভবন) অভ্যন্তরে ছিলেন তিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শেষ মুহূর্তের আরও স্পষ্ট বিবরণ দিয়েছেন।
ব্রিটিশ দৈনিক অবজার্ভারের সেই সময়ের সাংবাদিক ইয়াং কয়েক বছর পরে তার ওয়ার্ল্ডস অ্যাপার্ট বইতে লিখেছেন, গভর্নর হাউসের ভেতরে থাকা ইউএন কর্মকর্তা জন কেলি তাকে বলেছেন মালেক তার মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করছিলেন এবং তার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন সময় প্রথম বিমান হামলা শুরু হয়।
ইয়াং তখন কেলির সাথে গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান। তখন সন্ত্রস্ত মালেক জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি কি আমাদের এখন পদত্যাগ করা উচিত বলে মনে করেন?’ কিন্তু জাতিসংঘ প্রতিনিধি এর সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান।
তিনি স্মরণ করেন ঠিক সেই মুহূর্তেই দ্বিতীয় বিমান হামলা পাকিস্তানি প্রশাসনের স্থানীয় প্রধানকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে সম্বোধন করে পদত্যাগপত্র লিখতে প্ররোচিত করে।
ইয়াং লিখেছেন, ‘অভিযান চলমান অবস্থায় ধর্মপ্রাণ মুসলমান মালেক তার জুতা-মোজা খুলে অজু করে মাথায় সাদা রুমাল বেঁধে বাংকারে নামাজ পড়েন।’
‘এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ সরকারের পরিসমাপ্তি।’
পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক তাঁর বহুল পরিচিত আত্মসমর্পণের দলিলে লিখেছেন, ১৩ ডিসেম্বর গভর্নর এবং তাঁর প্রধান সহযোগীরা রাওয়ালপিন্ডির আদেশের অপেক্ষা করেছিলেন, ‘তবে প্রেসিডেন্ট ব্যস্ততার কারণে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছিলেন না বলে মনে হয়েছিল।’
‘পরদিন গভর্নর মালেক একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ডাকেন। এমন সময় সকাল ১১:১৫ টায় তিনটি ভারতীয় মিগ গভর্নর হাউস আক্রমণ করে এবং প্রধান হলের বিশাল ছাদ ধসে পড়ে। এতে গভর্নর বিমান হামলা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতে বাধ্য হন এবং সেখানে তিনি ‘তার পদত্যাগপত্র লিখেন।’
সালিক লিখেছেন, ‘এই অভিযানে কেবল একুরিয়ামে থাকা কিছু মাছ ছাড়া এ ক্ষমতা কেন্দ্রের প্রায় সকল বাসিন্দা বেঁচে যান। এগুলো উত্তপ্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর অস্থিরভাবে ধড়ফড় করতে করতে মারা যায়। সরকার ও গভর্নর হাউজের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।
‘১৪ ডিসেম্বর ছিল পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শেষ দিন।’
ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের তৎকালীন চিফ অফ জেনারেল স্টাফের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেআরএফ জ্যাকব তার ‘ঢাকায় আত্মসমর্পণ’-এ লিখেছেন, সামরিক গোয়েন্দা তথ্য থেকে তিনি জানতে পারেন যে মালেক ১২:০০টায় বৈঠকটি ডেকেছেন।
জ্যাকব বলেন, তিনি তখন ‘সভা বিঘ্নিত হলে গভর্নর আত্মসমর্পণের আহ্বান মেনে নিতে উৎসাহিত হবেন’ চিন্তা করে বিমান বাহিনীকে গভর্নর হাউসে আক্রমণ চালাতে বলেন।
তাঁর ‘ঢাকায় আত্মসমর্পণ’ বইতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের বিমানটি নির্ভুলভাবে আক্রমণ চালায়।’
বাসস/এআর/অনু-এইচএন/২২৩৫/আরজি