বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার আধুনিক রূপই হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ

418

ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে পিআইডির বিশেষ ফিচার
।। শহিদুল আলম মজুমদার ।।
ঢাকা, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০ (বাসস) : তথ্য প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রযাত্রায় বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বে ব্যবসা বাণিজ্যসহ সবকিছু পাল্টাতে শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি হয়ে ওঠে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ দেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ।
এ সুযোগকে কাজে লাগাতে বিভিন্ন দেশ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনেক দেশই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের সার্বিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে চলতে আর্থসামাজিকসহ সার্বিক উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানে শক্তিশালী একটি মাধ্যম।
ডিজিটাল বিপ্লবের পথ ধরে একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্ন থেকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সমাজের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব। বিশ্ব যখন প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেই উপলব্ধি থেকে বাংলাদেশও উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে ডিজিটাল বিপ্লবে শামিল হওয়াসহ আইসিটির ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা দেন। গণতন্ত্র, সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে এগিয়ে নেওয়াই ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য। জননেত্রী শেখ হাসিনার আধুনিক চিন্তা এবং খ্যাতিমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদের অভিজ্ঞাতালব্ধ জ্ঞান থেকে উৎসারিত এ ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অঙ্গীকার করা হয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা। মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, সমুদ্রসহ প্রায় সকল খাতে নানা উদ্যোগ ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন। ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের বিস্ময়কর আবিষ্কার বিশ্বে ডিজিটাল বিপ্লবে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। ডিজিটাল বিপ্লবে শামিল হওয়ার দূরদর্শী চিন্তা থেকে বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি স¤প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। জাতিসংঘের ১৫টি সংস্থার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আই টি ইউ) সদস্যপদ লাভের প্রচেষ্টা চালান তিনি।
তারই উদ্যোগ ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ আই টি ইউ এর সদস্যপদ লাভ করে। মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বেদবুনিয়া উপকেন্দ্রের উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধু। ডিজিটাল বিপ্লবের শামিল হওয়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর গৃহীত ও বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলো ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে মূল প্রেরণা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১২ মে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বে এলিট ক্লাবের গর্বিত সদস্য হই আমরা। দেশের সবগুলো টেলিভিশন চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করে স¤প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
১১ বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের চার স্তম্ভ-কানেক্টিভিটি, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, ই-গভর্মেন্ট এবং আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি প্রোমোশন-ঘিরে নেওয়া অধিকাংশ উদ্যোগের বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে, দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব স¤প্রসারণ ঘটে। ৩ হাজার ৬শ ৫০টি ইউনিয়ন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় আনা হয়েছে। আরও ১৫০টি ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক কেবল লাইনের মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় আসবে। দেশের ২৮টি স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক পার্ক। ইতোমধ্যে নির্মিত ৪টি হাইটেক ও সফটওয়্যার পার্কে ১০৮টি প্রতিষ্ঠানকে স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারা এ পর্যন্ত ২৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তব করেছে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৬ কোটি ৪১ লক্ষ ৭০ হাজারে উন্নীত হয়েছে (অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত)। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছ প্রায় ১১ কোটি। দেশে ৫ হাজার ৮শ ৬৫টি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ৬শ’রও বেশি সেবা ডিজিটালাইজ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামে বসেই শহরের সুবিধা ভোগ করছে দেশের মানুষ। শুধুমাত্র ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকেই এক দশকে মানুষকে ৪৬ কোটি সেবা দিয়ে উদ্যোক্তারা আয় করে ৩৯৬ কোটি টাকা।
ডিজিটাল সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে জাতিসংঘের ই-গভর্মেন্ট সূচকে বাংলাদেশের বড় উত্তরণ ঘটে ২০১৮ সালে। জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশের ই-গভর্মেন্ট কার্যক্রম নিয়ে দুই বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা শেষে ২০১৮ সালের ১৯ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ডেভেলপমেন্ট সূচকে বাংলাদেশ এগিয়েছে ৯ ধাপ আর ই-পার্টিসিপেশন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের ৩৩ ধাপ উন্নতি হয়। ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। আর ই-পার্টিসিপেশন (ইপিআই) সূচকে ৪১তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বাস্তবায়নাধীন ও ইউএনডিপি’র সহায়তায় পরিচালিত এটুআই প্রোগ্রামের উদ্যোগের ফলে সেবা গ্রহণে নাগরিকদের ১.৯২ বিলিয়ন সময়, ৮.১৪ বিলিয়ন খরচ এবং ১ মিলিয়ন যাতায়াত হ্রাস পেয়েছে। সা¤প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ এর কারণে সমগ্র বিশ্ব যখন বিপর্যস্ত, স্থবির হয়ে পড়েছিল অর্থনীতিসহ সকল কার্যক্রম। বিগত ১১ বছরে প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে ওঠার কারণে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে চলমান ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ। এ সময় সরকারি অফিসে প্রায় ১০ লক্ষ ই-নথি সম্পন্ন হয়েছে। যার সুফল সরাসরি ভোগ করেছে দেশের মানুষ।
বৈশ্বিক করোনা সঙ্কট মোকাবিলায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ নাগরিকদের জন্য করোনাভাইরাস সংক্রান্ত যে কোনো প্রয়োজনীয় পরামর্শ, করোনা সম্পর্কিত সকল সেবার হালনাগাদ তথ্যের জন্য করোনা পোর্টাল (িি.িপড়ৎড়হধ.মড়া.নফ) চালু করে। এ বিভাগের আওতাধীন এটুআই-এর উদ্যোগ করোনা বিষয়ক তথ্য সেবা, টেলিমেডিসিন সেবা, সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা, সেলফ করোনা টেস্টিংসহ অনেক নতুন সেবা যুক্ত করা হয় হেল্পলাইন ৩৩৩ নম্বরে। এছাড়া, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ‘হোম অফিস’ এর মাধ্যমে সচল ছিল সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাফতরিক কার্যক্রম। এমনকি বিচার বিভাগও এটুআই-এর সহযোগিতায় ‘ভার্চুয়াল কোর্ট’ এর মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে বিচারিক কার্যক্রম। ঘরে বসে দেশ-বিদেশে চাকরির নিবন্ধন, হজযাত্রীর নিবন্ধন, বিভিন্ন ধরনের দাপ্তরিক ফরম, ট্যাক্স, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি রেকর্ড ডিজিটালকরণ, ই-গভর্ন্যান্স ও ই-সেবা, টেন্ডার বা দরপত্রে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কাজকর্ম অনলাইনেই সম্পন্ন করা যাচ্ছে এখন। এছাড়া, এটুআই-এর সহায়তায় ই-নামজারি, আরএস খতিয়ান সিস্টেম, অনলাইন গ্রিভেন্স রিড্রেস সিস্টেম, জিটুপি পদ্ধতিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভাতা প্রদান ইত্যাদি প¬াটফর্ম সরকারি বিভিন্ন সেবাকে নাগরিকদের জন্য আরও সহজ করে তুলেছে।
সরকারের সকল দফতরকে একীভূত নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ৫৮টি মন্ত্রণালয়/বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ ২৪০টি সরকারি দফতর এবং ৬৪ জেলা ও নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলায় নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ১৮,৪৩৪টি সরকারি অফিসকে একীভূত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে ও ৮০০+ গুরত্বপূর্ণ দফতরে ভিডিও কনফারেন্সিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। উপজেলা পর্যন্ত সরকারি দফতরসমূহে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল দ্বারা সংযুক্ত করা হয়েছে। দেশের প্রান্তিক জনপদে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা সরবরাহের লক্ষ্যে ২,৬০০ ইউনিয়ন পরিষদ এবং দেশের ১ হাজার পুলিশ স্টেশনে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানের প্রক্রিয়া চলছে। তাছাড়া, ২২০৪টি ইউনিয়ন পরিষদে ওয়াইফাই জোন স্থাপন করে জনগণকে ইন্টারনেট সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ-সমূহকে সংযুক্ত করতে ১৯,৫০০ কি.মি. অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। দুর্গম এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক স্থাপন (কানেক্টেড বাংলাদেশ) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৭৭২টি দুর্গম ইউনিয়নকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কাজ চলমান রয়েছে। এর ফলে, বাংলাদেশের সকল ইউনিয়ন দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট কানেক্টিভিটির আওতায় আসবে। তথ্যপ্রযুক্তি দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মোবাইল ব্যাংকিং সাধারণ মানুষের জীবনে এনে দিয়েছে স্বস্তি। আইসিটি বিভাগের সহায়তায় ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং-এর ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম পৌঁছে গেছে শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত। দেশের ই-কমার্স ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে গ্রামীণ ই-কমার্স প্লাটফর্ম ‘একশপ’। ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাত প্রসারের ফলে নারী উদ্যোক্তাদের উপস্থিতি বাড়ছে।