রাজার মতই চলে গেলেন ভারত বর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি

349

॥দীপক মুখার্জী॥
কলকাতা, ২ সেপ্টেম্বর ২০২০ (বাসস) : রাজারমতো চলে গেলেন ভারতবর্ষের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রাজনীতিবিদ, নিপাট বাঙালি প্রণব মুখার্জি।
৮৫ বছর বয়সে একটি পূর্ণজীবন সম্পূর্ণভাবে কাটিয়ে ভারতবর্ষ তথা বাংলার মাটি থেকে বিদায় নিলেন অত্যন্ত ভদ্রলোক রাজনীতির চাণক্য।
দেশজুরে দোয়া, পূজা অর্চনা-প্রার্থনা আর সেনা হাসপাতালের চিকিৎসকদের শত প্রচেষ্টাকে হার মানিয়ে প্রয়াত হলেন বাংলা ও ভারতের অন্যতম রাজনীতিবিদ, অতি শিক্ষিত, উৎকৃষ্ট মেধা আর বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ ভূমীপুত্র প্রণব মুখার্জি। যেন বাংলার ভাগ্যাকাশ থেকে প্রস্থান ঘটলো একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
স্বাধীনতাত্তোর ভারতের সর্বাধিক শিক্ষা, মেধা, পরিশ্রম আনুশীলনে বাংলার একটি ছোট্র গ্রামের ‘বাঙালি সন্তান’ রাজনৈতিক কৌটল্য, ভারতরতেœ ভূষিত প্রণব মুখার্জী-র মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটাদেশ। মুর্শিদাবদ থেকে জঙ্গীপুর, কীর্ণাহার-মিরাটিসহ বাংলার সর্বস্তরের মানুষ ভারাক্রান্ত , মর্মাহত, শোকাহত।
মেধা আর মননের দীপ্রতায় ১৯৮৪ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মিরাটির বঙ্গ সন্তান যেন আকাশ ছুঁয়েছিলেন। পাঁচ দশকের রাজনীতিতে বিধান সভা, রাজ্যসভা, সাত বারের সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী থেকে ভারতের একমাত্র বাঙালি রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি।
আপদমস্তক তিনি ছিলেন একজন বাঙালি। ইংরেজী উচ্চরণেও বংলার টান, হিন্দি বলা বিশেষ রপ্ত হয়নি দিল্লিতে ৫০ বছর রাজনীতি করেও। তবুও অসমুদ্র হিমচগল সর্বজনের মাণ্যতা আদায় করে নিয়ে ছিলেন তিনি। বিশ্ববাসীও সপ্রশংস কুির্নশ জানিয়েছে তাঁর মননশীল মেধা-বুদ্ধি আর প্রজ্ঞাকে।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, ভারতরতœ প্রণব মুখার্জী ছিলেন এমনই ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রয়াণে শুধু ইতিহাসের অবসান ঘটেনি, বাঙালির গর্বের ভান্ডারেও গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হল।
রাজনীতিতে ঢোঁকার আগে তিনি শিক্ষক এবং সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। হাওড়া থেকে বাসে করে দক্ষিণ কলকাতার কলেজে অধ্যাপনা করতে যেতেন। অত্যন্ত সাধারণ জীবন-যাপণ করতেন তিনি।
বহু জটিল রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। দেশ পরিচালনায় তাঁর উপস্থিতি, প্রভাব, পরামর্শ সকলের কাছে সমাদৃত ছিল। ১৯৮৪ সালে মনমোহন সিংয়ের পরিচালিত ইউপি সরকারের মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষœমেধার মানব ও প্রধান সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে বিবেচিত ছিলেন প্রণব মুখার্জি। ২০১২ সালে ইউপি জোটের মনোনয়নে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
সেনা হাসপাতালে ২৩দিন ধরে নানা উপসর্গে সংকটজনক আবস্থায় থাকার পরে ৩১আগস্ট প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির জীবনযুদ্ধ থেমে যায়।
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলার রাজনৈতিক মহলে। প্রদেশ কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি ও তৃণমূল পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা শোক প্রকাশ করা হয়। ।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দোপাধ্যায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছে ‘একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারালাম।’ সোমবার সন্ধ্যায় প্রণব মুখার্জীর মৃত্যুর খবরে ব্যথিত হৃদয়ে তাঁর সাথে দীর্ঘদিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মমতা বলেন ‘ভারতরতœ প্রণব মুখার্জীর মৃত্যুর সঙ্গে একটি যুগের অবসান হলো, বহুদশক ধরে আমার একজন অভিভাবক ছিলেন তিনি।
শোক বার্তায় রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, ‘একটি যুগের অবসান হলো। ভারতীয় রাজনীতিতে গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হলো। তিনি ছিলেন বটবৃক্ষ। তাঁর কাছে গেলে সবাইকে তিনি পরামর্শ দিতেন, ¯েœহ করতেন সবাইকে। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাথে দেখা করার।’
মুকুল রায় শোক বার্তায় বলেছেন, প্রণব মুখার্জীর মৃত্যুতে ভারতের রাজনিতিতে একটি যুগের সমাপ্তি হলো। শোকাহত সিপিএম-এর রাজ্যস¤পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘আমরা একজন বাঙালি রাজনৈতিক প-িতকে হারালাম, মন্ত্রী সভার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে, আজীবন রাজ্যের মানুষের সাথে কথা বলার মতো একজনই ছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংক গঠন ছিল তাঁরই আনন্য অবদান।’
প্রদেশ কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্রাচার্য়্য প্রণব মুখার্জির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিত, উৎকৃষ্ট মেধা ও স্বচ্ছ রাজনীতির মানুষ ছিলেন তিনি, ছিলেন আমাদের অভিভাবক, তাঁর রাজনৈতিক চেতনা ভারতকে সমৃদ্ধ করে দিয়েছে, তাঁর মত বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ রাজনীতিতে খুব কম দেখা যায়। বর্তমান যুগে তিনি ছিলেন পথের দিশারী।’
কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধূরী বলেছেন, ‘প্রণবদা আমার রাজনৈতিক শিক্ষক, তিনি রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। অভিভাবকের মত তাঁর কাছে আশ্রয় পাওয়া যেত। তিনি ছিলেন ‘এনসাইক্লোপেডিয়া’। তাঁর মৃত্যুতে ভারতের রাজনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতি হলো।’
প্রণব মুখার্জির কাছে দেশের স্বার্থই ছিল অগ্রাধিকার। অধীর চৌধূরী বলেন, ‘সমস্যার গভীরে ঢুঁকে তার সহজ সমাধান করে দিতেন প্রণব’দা -এই সবই ছিল শিক্ষণীয় যা নতুন প্রজন্মের কাছে আনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’