প্রকাশিত রেকর্ড ১৯৭৫ অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়

340

॥ আনিসুর রহমান ও তানজিম আনোয়ার ॥
ঢাকা, ১৫ আগস্ট, ২০২০ (বাসস) : বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পেছনে মূল নেপথ্য নায়ক ছিলেন বলে পূর্বের জল্পনা-কল্পনাকে সত্য প্রতিপন্ন করে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে প্রকাশমান নথিপত্র ও নতুনতর গবেষণা তাকে এই চক্রান্তের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে সামনে নিয়ে আসছে।
জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে এক সাক্ষাৎকারে এই মামলায় বাদী পক্ষের অন্যতম প্রধান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাসসকে বলেন, ‘জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি, কারণ, তিনি বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মারা গিয়েছিলেন।’
তবে, তিনি অরো যোগ করেন, সমস্ত ইঙ্গিত থেকেই বোঝা যায় যে ঘাতকরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যকে হত্যার জন্য জিয়ার সম্মতি নিয়েই মাঠে অগ্রসর হয়েছিল।
আইনজীবী আনিসুল হক বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান প্রসিকিউটর সিরাজুল হকের প্রধান সহযোগী বা দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন। ঘটনাক্রমে সিরাজুল হক ছিলেন আনিসুল হকের পিতা। তিনি বলেন, জিয়া হত্যাকারীদের প্ররোচিত করেন এবং শেষ পর্যন্ত এই হত্যাকান্ডের মূল সুবিধাভোগী হন।
তিনি বলেন, এই মামলার সাজাপ্রাপ্ত অন্যতম প্রধান আসামি বরখাস্তকৃত কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান এবং তার প্রধান সহযোগী সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি বরখাস্তকৃত কর্নেল আবদুর রশিদের স্ত্রী জোবাইদা রশিদ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে খুনিরা এই চক্রান্ত নিয়ে জিয়ার কাছে যায় এবং এ রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের জন্য তার সম্মতি অর্জন করে।
রশিদের মেয়ে মেহনাজ রশিদ এই বিচারের পরপরই বাসস-এর একজন সংবাদদাতাকে দেয়া মন্তব্যে স্পষ্টতই সে সময়ের সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার বাবা এখন হত্যাকারী হিসাবে বিবেচিত, তবে, কে তাকে ব্যবহার করেছে? সেই ব্যক্তি ঘটনা পরম্পরায় নায়ক হিসাবে হাজির হন।’
তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ সম্প্রতি ‘১৫ ই আগস্ট: একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি’ শীর্ষক একটি বইতে হত্যাকান্ডের সময় এবং পরের পরিস্থিতির বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে তিনি হত্যাকারীদের সামরিক পদক্ষেপ থেকে রক্ষার জন্য তার ডেপুটির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেন।
‘১৫ আগস্টের ঘটনাবলীর কথা স্মরণ করে অশীতিপর জেনারেল লিখেছেন, ‘প্রথম দিন থেকে তিনি যেসব পদক্ষেপ নেন এবং তিনি আমাকে যে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন তার সবই ছিল বিদ্রোহী সৈন্যদের (হত্যাকারীদের) সহায়তা করার জন্য।’
শফিউল্লাহ জানান, ১৫ আগস্ট সকালে তিনি জিয়া এবং তৎকালীন সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফকে তার বাসায় আসতে বলেন এবং দু’জন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সেখানে উপস্থিত হন।
তবে, জিয়া ‘ইউনিফর্ম পরিহিত, সঠিকভাবে শেভ করা, তার সরকারি গাড়িতে এবং তার ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলেন। আর খালেদ শেভ না-করা এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে পাজামা (নাইট ড্রেস) পরে এসেছিলেন।’
শফিউল্লাহ লিখেছিলেন, ‘যদিও দু’জনেই প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে আমার সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন, তবু, এই পার্থক্যগুলো তখন আমাকে ভাবায়নি। পরে যখন আমার চিন্তা করার অবসর হল, কেবল তখনই আমি বুঝতে পারি কে কী করছিল!’
শফিউল্লাহ পরবর্তীকালে জানতে পারেন, তাকে জানানোর আগেই উপ-সেনা প্রধান হিসাবে জিয়া ঢাকা সেনানিবাস ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ ৪৬তম স্বাধীন পদাতিক ব্রিগেডের কর্নেল শাফাত জামিলকে কিছু নির্দেশনা দেন কিন্তু বিস্ময়করভাবে তার আদেশ সম্পর্কে তাকে কিছু জানাননি, যা সন্দেহজনক।
অন্যদিকে, শফিউল্লাহ যখন খালেদকে ঘাতকদের বিরুদ্ধে সৈন্য মুভ করাতে শাফাতকে সহায়তা করার জন্য ৪৬ ব্রিগেড এলাকায় যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখন ‘জেনারেল জিয়া এর তীব্র বিরোধিতা করেন’ এবং বলেন যে ‘তিনি (খালেদ) এটি বরবাদ করতে চলেছেন।’
শফিউল্লাহ লিখেছেন, ‘আমি এখন যখন এই মুহূর্তগুলোর কথা স্মরণ করার চেষ্টা করি তখন প্রশ্ন আসে ব্রিগেডিয়ার খালেদ কী বরবাদ করতে যাচ্ছিলেন, যার জন্য জেনারেল জিয়া এত চিন্তিত ছিলেন। ৪৬ ব্রিগেড অঞ্চলের ওই পদক্ষেপগুলো কি তিনি যে পরিকল্পনা করেছিলেন তার বিরুদ্ধে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল?’
তৎকালীন সেনাপ্রধান স্মৃতিচারণ করেন খালেদ ৪৬ ব্রিগেড থেকে ফিরে এসে তার রিপোর্টিং শেষ করার পরে, ‘জেনারেল জিয়া পরামর্শ দেন যে সিজিএস-এর এখন বাইরে যাওয়া উচিত হবে না, বরং একটি সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমণ মোকাবেলায় সেনাবাহিনীকে অগ্রসর করানোর জন্য একটি অপারেশন অর্ডার (অপস অর্ডার) প্রস্তুত করতে বসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যদিও এটি একটি সম্ভাবনা হতে পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত এরকম কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি (এবং) আমার জন্য তখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু সামলানো। আমি তাই জেনারেল জিয়াকে বললাম যে আমাকে প্রথমে এই নাজুক পরিস্থিতি সামলাতে দাও।’

শফিউল্লাহ্ বলেন, তিনি এখন বিশ্বাস করেন, জিয়া সম্ভবত ‘যা হচ্ছিল এবং তিনি যা করছিলেন, তাতে কোন ধরণের হস্তক্ষেপ চাননি এবং দন্ডিত রশিদের উপর তিনি এর দায় চাপান।
তিনি বলেন, রশিদ তাকে বলেছিলেন, জিয়া তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, ‘যদি তারা তাদের পরিকল্পনায় সফল হতে পারেন, তবে তিনি তাদের সাহায্য করবেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিদ্রোহী সেনারা লক্ষ অর্জনে সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী জেনারেল জিয়ার আশির্বাদপুষ্ট হয়েই এগুচ্ছিল। ব্রিগেডিয়ার খালেদের পদক্ষেপ তাদের পরিকল্পনার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারত। তাই, জিয়ার তথাকথিত ভারতীয় আগ্রাসনের আশঙ্কাটি আমার মনযোগ অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখার ছলনামূলক পন্থা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
শফিউল্লাহ বলেন, আমাকে সেনাপ্রধান বানানোর পর থেকেই জিয়া মূলত বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন।
তিনি আরো জানান, ‘খন্দকার মোশতাক এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে আগে থেকেই জানতেন এবং তিনি ছিলেন তার প্রতি সহানুভূতিশীল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় খন্দকার মোশতাক জেনারেল জিয়াকে সেনাপ্রধান বানান। জিয়া বিদ্রোহী সেনাদের পছন্দের মানুষ ছিলেন। জেনারেল জিয়া শেষ পর্যন্ত তিনি যা চেয়েছিলেন, তা হাসিল করলেন। আর এটাই ছিল তার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের প্রথম ধাপ।’
জিয়া যদি এই ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ত না-ই থাকতেন, তবে, হত্যাকারী সৈন্যরা সেনাপ্রধান হিসেবে কেন আর কারো নাম না বলে জিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন?
আইনমন্ত্রী জেনারেল শফিউল্লাহর বক্তব্যের সমর্থনে বলেন, ‘তার রাষ্ট্রপতি থাকার পুরো সময়টিতেই জিয়াউর রহমানকে নানাভাবে পুরস্কৃত করা হয় এবং এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার না করে তাদের রক্ষা করা হয়। কেন?
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের কয়েক বছরে পর বন্ধুবন্ধুর খুনী ফারুক ও রশিদ সাংবাদিক অ্যান্থনী মাসকারেনহাসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে স্বীকার করেন যে জিয়া এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন।
ফারুক ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি বৈঠকে জিয়ার অংশ গ্রহণের কথাও স্বীকার করেন।
বিবিসির একজন প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে লিফসুলৎজ বলেন, কয়েক বছর আগে তিনি নিশ্চিত হন যে, ঢাকায় সিআইএ’র তৎকালীন স্টেশন চিফের সঙ্গে জিয়ার এক দীর্ঘ বৈঠক হয়। সবকিছু বিশ্লেষণ করে এবং তৎকালীন পরিস্থিতি এটাই সাক্ষ্য দেয় যে বাংলাদেশের ইতিহাসের এই কালো অধ্যায়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাত ছিল।
ফার ইস্টার্ন ইকোনোমিক রিভিউয়ের সাবেক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রতিনিধি হিসেবে এবং যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসির মতো সনামধন্য সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক লিফসুলৎজ এর আগে বাসস-এর প্রতিনিধি আনিসুর রহমানকে বলেন, ‘জিয়া ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞের পিছনে প্রধান ছায়ামানব (নেপথ্য নায়ক) ছিলেন।’
কিন্তু জিয়ার সাথে সিআইএ কর্মকর্তা ফিলিপ চেরির বৈঠকের সর্বশেষ তথ্য এই কালো অধ্যায়ে জিয়ার সম্পৃক্ততাকে মূর্তমান করে তুলেছে।
তিনি ‘এ ঢাকা মিটিং প্রিসিডস দ্য ক্যুদেতা’ শিরোনামে লিখেন, ‘ঢাকাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকা- হলেও এর আগে এই ঘটনাগুলোই এই হত্যাকা-ের পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করে।
চেরির অনুরোধে বাংলাদেশী এক ব্যবসায়ী তার বাসায় এই বৈঠকের আয়োজন করেন।
ঢাকার কূটনৈতিক মহলে ওই ব্যবসায়ীর অনেক বন্ধু ছিল এবং তিনি চেরিকেও সিআইএ কর্মকর্তা হিসেবে নয়, মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে চিনতেন।
লিফসুলৎজ বলেন, ‘জেনারেল জিয়া ও ফিলিপ চেরি ওই বাড়ির বাগানে প্রায় এক ঘন্টা কথা বলেন।’ তিনি বলেন, ‘সেই সময় সবাইকেই যথেষ্ঠ নিষ্পাপ মনে হচ্ছিল।’
মার্কিন সাংবাদিকের মতে জিয়া এই অভ্যুত্থানের পেছনে কারা ছিলেন সে ব্যাপারে তদন্ত করার বিরোধীতা করেন। তাই, এটা কখনোই করা হয়ে উঠেনি।’
লিফসুলৎজ বলেন, ‘সমস্ত সাক্ষ্য প্রমাণ এরই ইঙ্গিত দেয় যে জিয়া এই অভ্যুত্থানের একজন প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন এবং এতে তিনি খন্দকার মোশতাকের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।’