সিলেটে গ্রেনেড হামলার ১৬ বছর পূর্তি আজ

331

সিলেট, ৭ আগস্ট, ২০২০ (বাসস) : সিলেটে গুলশান সেন্টারে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের উপর ভয়ংকর বোমা হামলার ১৬ বছর পূর্তি আজ। এ বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন।
এরমধ্যে গুরুতর আহত ২৫ জনকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল । এ ঘটনায় গুরুতর আহত মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ ইব্রাহিম হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
আজ থেকে ১৬ বছর আগে এদিনে সিলেট নগরীর তালতলাস্থ গুলশান সেন্টারে রাত ৮টার দিকে সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের সভা শেষে নেতৃবৃন্দকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ভাবে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। গ্রেনেডের বিকট শব্দে ও রক্তাক্ত মানুষের আর্তচিৎকারে সেদিন পূণ্যভুমি সিলেটের মাটি ও বাতাস ভারী হয়ে উঠে। ।
সিলেটবাসীর জন্য আজ ৭ আগস্ট শোকের দিন। দেশের ইতিহাসে অন্যতম এক জঘন্য দিন। বোমা আর গ্রেনেডের সাথে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের উত্থানপর্বের এই দিন সন্ধ্যায় কলংকিত হয়েছিল সিলেটের মাটি। ঐ বছরই মে-মাসে শহজালালের মাজারে বৃটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার পর আবার আগস্ট মাসে গুলশান সেন্টারে হামলা হলো।
সেই সন্ধ্যায় গুলশান সেন্টারে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের কর্মীসভা আয়োজন আয়োজন করা হয়েছিল। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি নির্ধারণের জন্যই সেখানে সিলেট মহানগর আওয়ামীলীগের প্রায় ৩৭ জন নেতাসহ অনেক কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সিলেটের তৎকালীন মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান একটি জানাজায় যোগ দিতে যাওয়ার কর্মসূচি ছিল। তাই সভাটি সংক্ষিপ্ত করা হয়।
সভাশেষে যখন নেতাকর্মীরা সেন্টারের সামনে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে খোশগল্প করছিলেন, ঠিক তখনি হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে।
খবর পেয়ে মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই দমকল বাহিনীর লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে আগুন নেভায়। এ বোমা হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন।
এরমধ্যে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল ২৫ জনকে। গুরুতর আহত কয়েকজনের মধ্যে রাত ১টা ১০ মিনিটে মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ ইব্রাহিম (গড়দুয়ারা, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম) মৃত্যুবরণ করেন। সিলেটে তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করছিলেন। অল্পের
জন্য বেঁচে যান বদর উদ্দিন আহমদ কামরান।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী আজও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। সাধারণ সম্পাদক (পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক) এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, প্রবীণ নেতা এনামুল হক ও অন্যতম নেতা এডভোকেট রাজ উদ্দিন, এডভোকেট মফুর আলী, অধ্যাপক জাকির হোসেন (বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক), ফয়জুল আনোয়ার আলাওর, আনোয়ার হোসেন রানা, এ টি এম হাসান জেবুল, জুবের খান, কবির আহমদ, এডভোকেট রাধিকা রঞ্জন চৌধুরী ও তপন মিত্র গুরুতর আহত হন।
দমকল বাহিনীর তৎকালীন উপপরিচালক তাজ উদ্দিন আহমদ ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সর্বপ্রথম ১২ জন আহতকে নিয়ে যান। এরপর যে যেভাবে পারে আহতদেরকে দ্রুত সেখানে নিয়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে প্রয়োজন দেখা দেয় রক্তের। এগিয়ে আসেন ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা। সেদিন চিকিৎসকরাও নিজেদের দায়িত্বাবোধের যে পরিচয় দেন তা অবশ্যই সিলেটবাসী চিরদিন মনে রাখবেন।
এডভোকেট রাজউদ্দিন সেই ভয়ংকর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ৫ আগস্ট সিলেটে বিভিন্ন সিনেমা হলে বোমা ও গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ওইদিন বিকেলে কোর্ট পয়েন্টে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের জনসভা শেষ করে তারা গুলশান সেন্টারের সভায় যোগ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এই হামলায় আহত সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সহসভাপতি এডভোকেট রাজ উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন সম্প্রতি বিস্ফোরণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, দ্রুত সভার কাজ শেষ করে আমরা যখন বাইরে খোশগল্প করছিলাম, ঠিক তখনই হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। চোখের সামনেই একটি জিপগাড়ি অগ্নিকুন্ডলী হয়ে উঠে যায় কয়েক ফুট উঁচুতে। রক্তাক্ত নেতাকর্মীদের চিৎকারে গোটা এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠে।
ওই হামলায় আহন হন আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে এ ধরনের হামলা ন্যক্করজনক। কোনো সভ্য সমাজে এ ধরনের জঘণ্য হামলার ঘটনা ঘটতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্তে ভয়ানক এ হামলা হয়েছিল।
এই হামলায় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শুরুর আগেই মৃত্যুবরণ করেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক মো. ইব্রাহীম আলী।
এ হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন। এখনও তাদের কারও কারও জীবন রীতিমতো বিছানাবন্দী। আর শরীরে স্পিøন্টারের চরম যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে।
উল্লেখ্য, এরই কিছুদিন পর ২১ আগষ্ট ঢাকা বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামীলীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়,এতে আওয়ামীলীগ সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও অনেক নেতাকর্মী গুরুতর আহত আহত এবং আওয়ামীলীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ অনেকেই নিহত হন।
সিলেটে এ হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটি এখনও বিচারাধীন। তবে মামলায় মূল অভিযুক্ত মুফতি হান্নান ও বিপুলকে অন্য একটি মামলায় ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।