কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সরকারের ১২.১১ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা

470

ঢাকা, ৪ জুন, ২০২০ (বাসস) : প্রাণঘাতি কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিস্তার রোধে দেশব্যাপী শাটডাউন ঘোষণার কারণে জনগণের দুর্ভোগ হ্রাসে সরকার এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন খাতে ১২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার বা ১,০২,৯৫৭ কোটি টাকার ১৯ টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র (পিএমও) আজ বাসসকে বলেছে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা- ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে দেশে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এ পর্যন্ত মোটে ১৯ টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, আর্থিক দিক দিয়ে যার মোট পরিমাণ ১ লাখ ২ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ যা ১২ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।’
এতে বলা হয়েছে, রফতানিমুখী শিল্প, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প, কৃষি, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি ও প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতকে এই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় আনা হয়েছে।
প্যাকেজগুলোর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাত সংস্থাগুলোকে কর্মক্ষম মূলধন সুবিধা প্রদানের জন্য সর্বাধিক পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, এরপরে ক্ষুদ্র (কুটির শিল্পসহ) ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চলতি মূলধন সরবরাহের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
সরকার ঘোষিত অন্যান্য প্রণোদনা প্যাকেজ হলো রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ তহবিল ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) বাড়িয়ে করেছে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা।
এছাড়া রয়েছে, ৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট প্রকল্পের মতো প্রণোদনা প্যাকেজ, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ১০০ কোটি টাকার বিশেষ সম্মাননা, ৭৫০ কোটি টাকার স্বাস্থ্য বীমা ও জীবন বীমা এবং ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার খাদ্য সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ কর্মসূচি সরকার করে ঘোষণা ।
সরকার এখন পর্যন্ত ঘোষিত অন্যান্য প্রণোদনা প্যাকেজ হলো ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কৃষি ভর্তুকি, ৫ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে কৃষি পুনঃতফসিলকরণ প্রকল্প, স্বল্প আয়ের পেশাদার কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল প্রকল্প, প্রতি কেজি ১০ টাকায় চাল বিক্রি করা ২৫১ কোটি টাকা, এবং লক্ষ্যভিত্তিক সম্প্রদায়ের মধ্যে নগদ বিতরণ ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা।
এছাড়াও ভাতা কর্মসূচির আওতা ৮১৫ কোটি টাকা বাড়ানো, গৃহহীন মানুষের জন্য ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, বাড়িঘর করতে, বোরো ধান/ধান ক্রয় কার্যক্রম (অতিরিক্ত ২ লাখ টন) ৮৬০ কোটি টাকা এবং কৃষিকাজের যান্ত্রিকীকরণের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ করোনভাইরাস শুরু হওয়ার পর ২০০ কোটি টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৪ মে, কোভিড-১৯ মহামারীতে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন।
এই কর্মসূচির আওতায় কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ নিঃস্ব পরিবারের প্রত্যেকে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) এর মাধ্যমে ঈদের আগে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পেয়েছেন।
সূত্র জানায়, এই নগদ সহায়তার মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি লোক প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে। কারণ, ৫০ লাখ পরিবারে প্রতিটি গড়ে চারজনকে গণনা করা হয়েছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকার কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ সহায়তা ছাড়াও খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি কেজি ১০ টাকায় বিক্রি করার জন্য ৮০ হাজার টন চাল বরাদ্দ দিয়েছি এবং এই (মে) মাসে দরিদ্র পরিবারগুলেরা জন্য, তারা যেন এই চাল কিনতে পারেন তাই তার সরকার অতিরিক্ত ৫০ লাখ কার্ড ইস্যু করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোন সহায়তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া কর্মহীন ৫০ লাখ পরিবারকে মোট ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিটি পরিবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দুই দফায় ১৭ কোটি টাকারও বেশি অর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, এবং মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ১২২ কোটি ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা হিসাবে প্রদান করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, সরকার সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যও বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করেছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
মহামারীর কারণে কর্মহীন যুবক ও প্রবাসীদের সহায়তার জন্য পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক এবং পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনকে মোট আড়াই হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত মূলধন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
কৃষকরা যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান সে জন্য সরকার ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘চলতি মৌসুমে সরকার ২২ দশমিক ২৫ লাখ টন খাদ্যশস্য ক্রয় করবে, যা আগের বছরের চেয়ে ২ লাখ টন বেশি। ’
এছাড়াও, সরকার কৃষকদের ভর্তুকি মূল্যে কম্বাইন্ড হারভেস্টর এবং রিপারস্ যন্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে এবং এর জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, কোভিড-১৯ এর কৃষিক্ষেত্রের ক্ষতি পূরণের জন্য কৃষকদের জন্য মাত্র ৪ শতাংশ সুদে অতিরিক্ত ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
সূত্রমতে, রফতানিমুখী শিল্পের জন্য বিশেষ তহবিলের বিপরীতে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা কার্যকর করা হয়েছে এবং যারা কাজে যোগ দিতে পারেননি তারাও ৬০ শতাংশ বেতন পাচ্ছেন।
‘এই প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বেতন এবং ভাতা প্রদান ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
গত ৩১ মে, প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক ঋণ গ্রহীতাদের ১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার ব্যাংক সুদ মওকুফ করতে ১৯ তম এবং সর্বশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন।
সর্বশেষ প্যাকেজ ঘোষণার সময় তিনি বলেছিলেন, সরকার ব্যাংকগুলিকে ভর্তুকি হিসাবে সুদ দেবে এবং এতে প্রায় ১ দশমিক ৩৮ কোটি ঋণ গ্রহীতারা সরাসরি উপকৃত হবেন।
শেখ হাসিনা ঈদুল ফিতরের আগে জাতির উদ্দেশে দেয়া তাঁর ভাষণে ঘোষণা করেন, কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের ফলে, ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার জন্য সরকার যে সব কর্মসূচি শুরু করেছে, চলমান সংকট শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ‘সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত আমি ও আমার সরকার আপনাদের পাশে থাকব ইনশাআল্লাহ।