সমন্বিত শিক্ষাই নারীর প্রতি সহিংস মনোভাব দূর করতে পারে : বিশেষজ্ঞদের অভিমত

391

॥ মাহফুজা জেসমিন ॥
ঢাকা, ৮ মার্চ, ২০২০ (বাসস) : নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রধান বাধা নারীর প্রতি সহিংস মনোভাব। তাই, পরিবার, সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত শিক্ষাই নারীর প্রতি সহিংস মনোভাব দূর করতে পারে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে বাসসের সাথে আলাপকালে এ মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ, মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকতায় প্রতিষ্ঠিত নারীরা।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর সরকার বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের মধ্যে দিয়েই নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথ উন্মুক্ত করেছে। যার মধ্য দিয়ে নারী আন্দোলনের অর্জন দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু নারীর অগ্রযাত্রায় এখনো বাধা হয়ে আছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী দিবসকে সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী চলছে নানা আয়োজন। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারও নারীর ক্ষমতায়নে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছে অর্ধকোটিরও বেশি প্রান্তিক নারী ।
নারী দিবসকে সামনে রেখে কথা হয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র সাংবাদিক ফরিদা ইয়াসমিন-এর সাথে।
তারা প্রত্যেকেই মনে করেন, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বিশেষ করে গত দশ বছরে নারীর অর্জন অনেক। বিভিন্ন সময়ে তাদের যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা সেটা যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে পালন করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, নারীর সমতার পথে নারীর যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা কোন বাঁধা নয়। বরং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংস মনোভাব এখনো নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে প্রধান বাধা হয়ে আছে।
নারী দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’। বাংলাদেশের নারী আন্দোলন কর্মীরা একে আরো সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, ‘নারীর সম-অধিকার বাস্তবায়নে আমি সমতার প্রজন্ম’। এই সমতার প্রজন্মই কিন্তু আজকের আমি এবং ভবিষ্যতের আমিও। এই প্রত্যেক প্রজন্মেরই রয়েছে ধারাবাহিক নৈতিক শিক্ষা। নৈতিক শিক্ষা যদি নারীর প্রতি সমতার শিক্ষা না দেয় তাহলে নারী-পুরুষের বৈষম্যমুক্ত সমাজ নির্মাণ কখনোই শতভাগ সফল হবে না।
অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমদ বাসস’কে বলেন, নারী শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নারী শিক্ষার ব্যাপ্তি তৃণমূল থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নারীদের এগিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। কিন্তু একই সাথে নারীর প্রতি সহিংস মনোভাব নারীকে সমানতালে এগিয়ে যেতে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি মনে করেন, নারী-পুরুষের সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে দায়িত্ব নিতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই। প্রাথমিকের শিক্ষা কারিকুলামে শিশুকে সমতার ধারণা দিতে হবে। নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা শেখাতে হবে। নারীর প্রতি সহমর্মিতা ও সংবেদশীলতার শিক্ষা দিতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে নারীর প্রতি অবমাননাকর শব্দের ব্যবহার শিশু মনে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ শীপা হাফিজা। তিনি বলেন, শিক্ষা কেবল স্কুল কেন্দ্রিক হবে না। শিক্ষা হবে সমাজকেন্দ্রিক। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ প্রত্যেকে সম্মিলিতভাবে শিশুর মনোবিকাশে কাজ করতে হবে। তাদের জীবনাচরণেও সমতার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
সাংবাদিক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের রাজনীতি, শিক্ষা, সমাজ ও পেশাগত অবস্থানে নারীর ক্ষমতায়নের দৃশ্যমানতা অনেক বেশি। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ না হলে প্রকৃত ক্ষমতায়ন হবে না। তিনি বলেন, পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তকে সমতার ধারণা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশে গত দশ বছরে রাজনীতি, কূটনীতি, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ উচ্চ পর্যায়ে নারীদের যেসব দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তা বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। কিন্তু গত এক বছরে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা যতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে তা এই অর্জনকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ অনেক। যা সমাজে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একেকটি সিঁড়ি হিসেবে কাজ করতে পারে।
ঢাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপিকা নাসরীন আহমাদ বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে আমাদের অনেক আইন রয়েছে। কিন্তু এর কার্যকর প্রয়োগ ও ব্যবহার না থাকলে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে না। আইন থাকার কারণে আইনের অপব্যবহারও কোথাও কোথাও হচ্ছে। তাই, রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহারের প্রতি আরো বেশি যতœশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা আজ আর অভাবী নই। অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়েছে। মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু আমাদের নৈতিক মূল্যবোধ নীচে নেমে গেছে। আমরা যেন দিন দিন খারাপ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছি’- এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে নৈতিক শিক্ষা প্রসারের ওপর জোর দেন।
মানবাধিকার কর্মী শীপা হাফিজা বলেন, নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণে সরকার অনেকগুলো আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহার-এর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিভঙ্গি আজো আশাব্যাঞ্জক নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো আইনগুলোকে যুগোপযোগী করারও প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
তিনি নারীর প্রতি সার্বিক সহিংসতা দূর করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘নারীর জন্য ক্ষমতায়নের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে সার্বিক ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা দূর করতে সেইফ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও নারীর প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।’