দিবা-রাত্রির টেস্ট তৃতীয় দিনে নিলো বাংলাদেশ

237

কলকাতা, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ (বাসস) : প্রথম দিন পৌনে তিন ঘন্টায় বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হওয়া, প্রশ্ন উঠেছিলো- কতদিনে শেষ হবে ইডেনের দিবা-রাত্রির টেস্ট? প্রশ্নের উত্তরের জন্য ভারতের প্রথম ইনিংসের দৈর্ঘ্য কতটা বড় হয়, সেটির অপেক্ষায় ছিলেন ক্রিকেটপ্রেমিরা। অধিনায়ক বিরাট কোহলির ১৩৬ রানের সুবাদে দ্বিতীয় দিনের চা-বিরতির আগে ৯ উইকেটে ৩৪৭ রানে নিজেদের প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে ভারত। এরপর ব্যাট হাতে নেমে আবারো দিশেহারা হয়ে পড়েন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। স্কোর বোর্ডে ১৩ রান উঠতেই নেই ৪ উইকেট। তাই প্রথম দিনের প্রশ্নের উত্তর দ্বিতীয় দিনের চা-বিরতির পর দিতে থাকেন ক্রিকেটপ্রেমিরা। আর সেটি হলো- দু’দিনেই শেষ হবে কলকাতার ঐতিহাসিক টেস্টটি। বাংলাদেশ হারতে চলেছে খুবই বাজেভাবে।
কিন্তু সেটি আর হতে দেননি বাংলাদেশের দুই কান্ডারি মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে তৃতীয় দিনে ম্যাচ নিয়ে যাবার পথ তৈরি করেন তারা। ফলে ৬ উইকেটে ১৫২ রান তুলে দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ করে বাংলাদেশ। তবে ইনিংস হারের মুখে আছে টাইগাররা। ইনিংস হার এড়াতে বাকী ৪ উইকেটে আরও ৮৯ রান করতে হবে বাংলাদেশকে। মাহমুদুল্লাহ ৩৯ রানে আহত অবসর নিলেও, ৫৯ রানে অপরাজিত আছেন মুশফিক।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ দল মাত্র ১০৬ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে প্রথম দিনই বড় লিডের আভাস দিয়েছিলো ভারত। কারণ ৩ উইকেটে ১৭৪ রান তুলে ৬৮ রানে এগিয়ে ছিলো টিম ইন্ডিয়া। অধিনায়ক বিরাট কোহলি ৫৯ ও আজিঙ্কা রাহানে ২৩ রানে অপরাজিত ছিলেন। দ্বিতীয় দিনের শুরু থেকে বেশ সাচ্ছন্দ্যে ব্যাট করছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। টেস্ট ক্যারিয়ারের ২২তম হাফ-সেঞ্চুরি তুলে নেন রাহানে। সেঞ্চুরির পথে হাটছিলেন কোহলি। তবে দলীয় ২৩৬ রানে প্যাভিলিয়নে ফিরেন রাহানে।
বাংলাদেশের স্পিনার তাইজুল ইসলামের বলে কাট করতে গিয়ে ব্যাট-বলের যোগাযোগ ঠিকভাবে করতে না পেরে পয়েন্টে এবাদতকে ক্যাচ দেন ৬৯ বল মোকাবেলায় ৭টি বাউন্ডারিতে ৫১ রান করা রাহানে। তবে আউট হওয়ার আগে কোহলিকে নিয়ে চতুর্থ উইকেটে ৯৯ রান যোগ করেন তিনি।
সতীর্থকে হারানোর কিছুক্ষণ পর টেস্ট ক্যারিয়ারের ২৭তম সেঞ্চুরি তুলে নেন কোহলি। কোহলির সেঞ্চুরিতে ৪ উইকেটে ২৮৯ রান নিয়ে মধ্যাহ্ন-বিরতিতে যায় ভারত। এ অবস্থায় ভারতের লিড ছিলো ১৮৩ রান।
বিরতি থেকে ফিরে দ্বিতীয় সেশনের দ্বিতীয় বলেই রবীন্দ্র জাদেজাকে বিদায় দেন আবু জায়েদ। ১২ রান করেন জাদেজা। তবে লিডকে দ্রুত বাড়িয়ে নিতে মারমুখী হয়ে উঠেন কোহলি। ৭১তম ওভারে বাংলাদেশের পেসার এবাদতকে প্রথম চার বলেই বাউন্ডারি মারেন কোহলি। ঐ ওভার থেকে ১৯ রান তুলেন তিনি।
কিন্তু কোহলিকে ১৩৬ রানে থামিয়ে দেন এবাদতই। অবশ্য কোহলিকে ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় ‘কনকাশন সাব’ তাইজুল। ভারতের ইনিংসের ৮১তম ওভারে বাংলাদেশের পেসার এবাদতের বলে ডিপ স্কয়ার লেগে তাইজুলের অবিশ্বাস্য ক্যাচে আউট হন কোহলি। ডিপ স্কয়ার লেগে বাতাসে ভেসে ডান-দিকে ঝাপিয়ে পড়ে ক্যাচ নেন তাইজুল। আউট হওয়ার আগে ১৯৪ বলে ১৮টি চারে নিজের দুর্দান্ত ইনিংসটি সাজান কোহলি।
কোহলিকে তুলে নিয়ে ভারতের রানের লাগাম টেনে ধরার পথ পায় বাংলাদেশের বোলাররা। এরপরই ভারতের লোয়ার-অর্ডারে ধস নামান আল-আমিন ও আবু জায়েদ। রবীচন্দ্রন অশ্বিন ৯, উমেশ যাদব-ইশান্ত শর্মা শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফিরেন। দলীয় ৩৩১ রানে নবম উইকেট পতনের পর উইকেটরক্ষক ঋদ্ধিমান সাহা ও মোহাম্মদ সামি ১৬ রান দেন দলকে। ৯০তম ওভারের চতুর্থ বলের পরই ৯ উইকেটে ৩৪৭ রান তুলে নিজেদের ইনিংস ঘোষণা করে দেয় ভারত। সাহা ১৭ ও সামি ৫ বলে অপরাজিত ১০ রান করেন। বাংলাদেশের আল-আমিন ও এবাদত ৩টি করে, আবু জায়েদ ২টি এবং তাইজুল ১টি উইকেট নেন।
২৪১ রানের লিড নিয়ে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে ভারত। তাই প্রথমত ইনিংস হার এড়ানোর টার্গেট নিয়ে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসের মত এবারও ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তারা। ইনিংসের পঞ্চম বলেই ভারতের সফল পেসার ইশান্তের বলে লেগ বিফোর ফাঁদে পড়েন বাংলাদেশের ওপেনার সাদমান ইসলাম। প্রথম ইনিংসে দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ২৯ রান করা সাদমান এবার রানের খাতা খুলতে পারেননি।
শুন্য রানে প্রথম উইকেট হারানোর পর দ্বিতীয় ওভারে আরেক ওপেনার ইমরুল কায়েসের কল্যাণে রানে খাতা খোলে বাংলাদেশ। ঐ ওভারের শেষ বলে ২ রান নেন তিনি। পরের ওভারে পঞ্চম বলে আবারো বাংলাদেশ শিবিরে আঘাত হানেন ইশান্ত। প্রথম ইনিংসে শুন্য রান করা মোমিনুলকে এবারও খালি হাতে ফেরান ইশান্ত। ৬ বল খেলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন বাংলাদেশের অধিনায়ক।
প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়া দুই ব্যাটসম্যান শূন্য হাতে বিদায় নেন। এরপর উইকেটে গিয়ে নিজের মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই ২ রান তুলে নেন মোহাম্মদ মিঠুন। ফলে হাফ ছেড়ে বাঁচেন তিনি। প্রথম ইনিংসে শুন্য রানে ফিরে রেকর্ড বইয়ে নাম তুলেছিলেন তিনি। অবশ্য মোমিনুল-মুশফিকও শূন্য রানে ফেরায় রেকর্ড বইয়ে নাম উঠে মিঠুনের।
হাফ ছেড়ে বাঁচলেও এবারও নিজের ইনিংসকে বড় করতে পারেননি মিঠুন। ৬ রানে মিঠুনকে থামান ভারতের আরেক পেসার উমেশ যাদব। পরের ওভারে আরেক ওপেনার ইমরুলকে বিদায় দিয়ে তৃতীয় উইকেট তুলে নেন ইশান্ত। ৫ রান করেন ইমরুল। তাই ১৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে আজই, অর্থাৎ দ্বিতীয় দিনেই হেরে যাওয়ার আবহ তৈরী হয় বাংলাদেশের সামনে।
কিন্তু দলের উইকেট পতনের ¯্রােত আটকে দেন দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিক ও মাহমুমুদল্লাহ। ভারতীয় পেসাদের উপর চড়াও হন তারা। দক্ষতার সাথেই বাউন্ডারি তুলে নিচ্ছিলেন মুশফিক ও মাহমুমুদল্লাহ জুটি। তাই উইকেট পতনের ¯্রােত থামিয়ে ১২তম ওভারেই দলের স্কোর ৫০ পার করেন মুশফিক ও মাহমুমুদল্লাহ। এতে উইকেটে সেটও হয়ে গিয়েছিলেন তারা।
সেট হয়ে যাবার ফলে নিজেদের ও দলের স্কোর বড় করছিলেন মুশফিক ও মাহমুমুদল্লাহ। কিন্তু দুভার্গ্য ভর করে বসে মাহমুদুল্লাহ’র ভাগ্যে। ১৯তম ওভারে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে আহত অবসর হয়ে মাঠ ছাড়েন মাহমুদুল্লাহ। ৭টি চারে ৪১ বল মোকাবেলা করে ৩৯ রান করেন মাহমুদুল্লাহ।
মাহমুদুল্লাহ’র বিদায়ে ক্রিজে যান লিটন দাসের পরিবর্তে ‘কনকাশন সাব’ হওয়া মেহেদি হাসান মিরাজ। দু’টি চার ও ১টি ছক্কায় দারুন শুরু করেছিলেন মিরাজ। তবে ১৫ রানের বেশি করতে পারেননি তিনি। ইশান্তের বলে কোহলির হাতে ক্যাচ দেন ২২ বলে ১৫ রান করা মিরাজ। তিনি। মুশফিকের সাথে গুরুত্বপূর্ণ ৫১ রান যোগ করে দলের প্রথম ইনিংসের সংগ্রহকে অতিক্রম করান মিরাজ। এই জুটিতেই টেস্ট ক্যারিয়ারের ২১তম হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মুশফিক।
এরপর মুশফিকের সাথে জুটি বাঁধেন তাইজুল। দু’জনের অবিচ্ছিন্ন থেকে দিন শেষ করার পরিকল্পনায় ছিলেন। কিন্তু তাইজুলকে ব্যক্তিগত ১১ রানে আউট করেন ভারতের উমেশ। এরপরই দিনের খেলার ইতি টানেন অন-ফিল্ড আম্পায়াররা। ১০টি চারে ৭০ বলে ৫৯ রানে অপরাজিত আছেন মুশফিক। ভারতের ইশান্ত ৪টি ও উমেশ ২টি উইকেট নেন।
স্কোর কার্ড (টস-বাংলাদেশ) :
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ১০৬/১০, ৩০.৩ ওভার (সাদমান ২৯, লিটন ২৪ আহত অবসর, ইশান্ত ৫/২২)।
ভারত প্রথম ইনিংস : (আগের দিন ১৭৪/৩, ৪৬ ওভার, কোহলি ৫৯*, রাহানে ২৩*)
মায়াঙ্ক আগারওয়াল ক অতি (মিরাজ) ব আল-আমিন ১৪
রোহিত শর্মা এলবিডব্লু ব এবাদত ২১
চেতেশ্বর পূজারা ক সাদমান ব এবাদত ৫৫
বিরাট কোহলি ক অতি (তাইজুল) ব এবাদত ১৩৬
আজিঙ্কা রাহানে ক এবাদত ব তাইজুল ৫১
রবীন্দ্র জাদেজা বোল্ড ব আবু জায়েদ ১২
ঋদ্ধিমান সাহা অপরাজিত ১৭
রবীচন্দ্রন অশ্বিন এলবিডব্লু ব আল-আমিন ৯
উমেশ যাদব ক সাদমান ব আবু জায়েদ ০
ইশান্ত শর্মা এলবিডব্লু ব আল-আমিন ০
মোহাম্মদ সামি অপরাজিত ১০
অতিরিক্ত (বা-১২, লে বা-২, ও-৮) ২২
মোট (৯ উইকেট, ডিক্লেয়ার, ৮৯.৪ ওভার) ৩৪৭
উইকেট পতন : ১/২৬ (আগারওয়াল), ২/৪৩ (রোহিত), ৩/১৩৭ (পূজারা), ৪/২৩৬ (রাহানে), ৫/২৮৯ (জাদেজা), ৬/৩০৮ (কোহলি), ৭/৩২৯ (অশ্বিন), ৮/৩৩০ (উমেশ), ৯/৩৩১ (ইশান্ত)।
বাংলাদেশ বোলিং :
আল-আমিন : ২২.৪-৩-৮৫-৩ (ও-১),
আবু জায়েদ : ২১-৬-৭৭-২,
এবাদত হোসেন : ২১-৩-৯১-৩ (ও-৩),
তাইজুল : ২৫-২-৮০-১।
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস :
সাদমান ইসলাম এলবিডব্লু ব ইশান্ত ০
ইমরুল কায়েস ক কোহলি ব ইশান্ত ৫
মোমিনুল হক ক সাহা ব ইশান্ত ০
মোহাম্মদ মিঠুন ক সামি ব উমেশ ৬
মুশফিকুর রহিম অপরাজিত ৫৯
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আহত অবসর ৩৯
মেহেদি হাসান মিরাজ ক কোহলি ব ইশান্ত ১৫
তাইজুল ইসলাম ক রাহানে ব উমেশ ১১
অতিরিক্ত (বা-৮, লে বা-৪, ও-৫) ১৭
মোট (৬ উইকেট, ৩২.৩ ওভার) ১৫২
উইকেট পতন : ১/০ (সাদমান), ২/২ (মোমিনুল), ৩/৯ (মিঠুন), ৪/১৩ (ইমরুল), ৪/৮২* (মাহমুদুল্লাহ আহত অবসর), ৫/১৩৩ (মিরাজ), ৫/১৫২ (তাইজুল।
ভারত বোলিং :
ইশান্ত : ৯-১-৩৯-৪,
উমেশ : ১০.৩-০-৪০-২,
সামি : ৮-০-৪২-০ (ও-৫),
অশ্বিন : ৫-০-১৯-০।