রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আহবান

449

ঢাকা, ২৯ আগস্ট, ২০১৯ (বাসস) : পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আরো জোরালো ভূমিকা রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন, মিয়ানমার এখনো দোষারোপের খেলা খেলছে এবং বিভান্তিকর তথ্য দিয়ে ও প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার নিজস্ব দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে অব্যাহতভাবে দোষারোপের খেলা খেলছে এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করছে এবং প্রকৃত ঘটনার আড়াল করছে। তিনি আজ নগরীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকা ভিত্তিক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের প্রতিনিধিদের ব্রিফকালে এ কথা বলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম এবং পররাষ্ট্র সচিব এ শহিদুল হক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, মিয়ানমার সরকার দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তিনি সমস্যার একটি গ্রহনযোগ্য সমাধানের জন্য মিয়ানমার সরকারের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহবান জানান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের অসহযোগিতার অভিযোগকে ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার যে কোন সময়ে মিয়ানমারে ফিরে যেতে কাউকে বাধা না দেয়ার নীতিগত অবস্থানে অটল আছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার সব সময়ে কারো স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যেতে বাংলাদেশের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম এবং জাতিসংঘ সংস্থাকে অনুমতি দেওয়ায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমগুলো প্রতিদিনের ঘটনা পযর্বেক্ষণ করছে এবং বাংলাদেশও দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের গ্রহণে মিয়ানমারের সদিচ্ছার বিষযটি মনিটর করছে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনায় দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পযর্বেক্ষনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পযর্বেক্ষক উপস্থিতির আহবান জানানো হয়। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সেক্রেটারির নেতৃত্বে এ প্রতিনিধি দলটি গত ২৭-২৮ জুলাই বাংলাদেশ সফর করে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌছুতে মিয়ানমার প্রতিনিধি সে দেশ থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়।

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার প্রতিনিধি দল রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, অধিকার ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতির কথা জানাতে না পারায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা চরম হতাশা ব্যক্ত করে।’
দ্বিপক্ষীয় চুক্তি পরিপালন না করায় বাংলাদেশ মিয়ানমার নাগরিকদের ফেরত পাঠাতে পারেনি অভিযোগ করে তড়িঘড়ি করে ২২ আগস্ট একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ইস্যু করার জন্য মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী বাস্তুচ্যুত এসব লোকেদের স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে উৎসাহিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের ওপরই বর্তায়।
তিনি বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে সুনিশ্চিত কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং সরেজমিন বাস্তবতার আলোকে নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহসহ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের আস্থার ঘাটতি কমানোর দায়িত্ব মিয়ানমারের।’
ড. মোমেন বলেন, গত বছরের ১৫ নভেম্বর একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর বাংলাদেশ ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্য থেকে মিয়ানমারের যাচাইকরা ৩ হাজার ৪শ ৫০জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা তৈরি করে ২২ আগস্ট তাদের ফেরত পাঠানোর আরেকটি উদ্যোগ নেয়।
তিনি বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলে বারবার দাবি করায় এবং গত ২৭-২৮ জুলাই মিয়ানমারের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাস্তুচ্যুত লোকদের ফিরে যেতে রাজি করাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে সম্মত হয়।
পররাষ্টমন্ত্রী বলেন, ‘কিন্তু দুঃখের বিষয়, মিয়ানমার তাদের বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যকার আস্থার ঘাটতি দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
ড. মোমেন বলেন, তালিকাভুক্ত ৩, ৪৫০ রোহিঙ্গার মধ্য থেকে ইউএনএইচসিআর ২২ আগস্ট পর্যন্ত ১, ২৭৬ সদস্যের ৩৩৯ পরিবারের সাক্ষাৎকার নেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সার্বিক পরিবেশ তাদের ফিরে যাবার অনুকূল নয় উল্লেখ করে ফিরে যেতে রাজি হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তির স্পিরিট অনুযায়ী মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গাদের উদ্বেগ নিরসনের জন্য দৃশ্যমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সঠিক তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি করানোর দায়িত্বও মিয়ানমার সরকারকে নিতে হবে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য-প্রমাণবিহীন অসার দাবি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুতে কোন অবদান রাখবে না।’