একুশে আগস্ট ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী পালিত

3641

ঢাকা, ২১ আগস্ট, ২০১৯ (বাসস) : বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যদিয়ে জাতি আজ একুশে আগস্ট ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী পালন করেছে।
এ উপলক্ষে সকালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত বেদিতে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নেতৃবৃন্দ একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
দেড় দশক আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে নারকীয় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতা সেদিন অল্পের জন্য এই ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে গেলেও এ ঘটনায় অপর ২৪ জন নিহত হন।
প্রথমে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে শহীদদের স্মরণে স্থাপিত বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা জানানো শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টার মাইন্ড তারেক রহমানের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। এ জন্য উচ্চ আদালতে হওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে। অবশ্যই উচ্চ আদালতে যাব। এই গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানের জবানবান্দিতে আছে তারেক রহমানের নির্দেশ মেনেই তারা সেদিন অপারেশন চালিয়েছিল। এই হত্যাকান্ডের যেমন বিচার হয়েছে, হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ডদেরও সর্বোচ্চ বিচার হতে হবে।’
তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদও এসময় সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০০৪ সালের ২১ শে আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় প্রধান শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধীর জনসভায় গ্রেনেড হামলার দায় বেগম খালেদা জিয়ারও দায় রয়েছে, তিনি তা এড়াতে পারেন না ।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফরউল্লাহ, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী ও উপ-দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া উপস্থিত ছিলেন।
পরে ১৪ দলের পক্ষ থেকেও শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া।
এর আগে সকালে একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত বেদিতে জড়ো হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
বাংলাদেশ যুবমৈত্রী সকাল দশটায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত বেদিতে একুশে আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাজানায়। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক অরুন সরকার রানার নেতৃত্বে জোটের নেতৃবৃন্দ অস্থায়ী বেদিতে পুস্পমাল্য অর্পন করেন। পরে সংগঠনের গুলশান কার্যালয়ে জোটের সভাপতি সারাহ বেগম কবরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় ।
দিবসটি উপলক্ষেএকই দিন বিকেল ৪টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে আওয়ামী লীগ । এতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে একটি ট্রাকের উপর অস্থায়ী মঞ্চে যখন শেখ হাসিনা বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন আকস্মিক এই হামলায় প্রায়ত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান এবং আরো ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হন।
এছাড়াও এই হামলায় আরো ৪শ’ জন আহত হন। আহতদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি। শেখ হাসিনার বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আকস্মিক গ্রেনেড বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলে মারাত্মক বিশৃংখলা, ভয়াবহ মৃত্যু ও দিনের আলো মুছে গিয়ে এক ধোয়াচ্ছন্ন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
দেশের বৃহৎ এই রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূণ্য করতে এ হামলা করা হয়েছিল বলে দলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়েছিল।
ঢাকা’র তৎকালিন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী তাৎক্ষণিকভাবে এক মানব বলয় তৈরি করে নিজেরা আঘাত সহ্য করে তাঁকে গ্রেনেডের হাত থেকে রক্ষা করেন।
মেয়র হা্িনফের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত অস্ত্রোপাচার করার কথা থাকলেও গ্রেনেডের স্পিন্টার শরীরে থাকার কারণে তার অস্ত্রোপাচার করা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি ব্যাংকক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এদিকে শেখ হাসিনা গ্রেনেডের আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর শ্রবণ শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।
এই বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় উল্লেখযোগ্য নিহতরা হলেন, আইভি রহমান, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব:) মাহবুবুর রশীদ, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদার, আতিক সরকার, আবদুল কুদ্দুস পাটোয়ারি, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্ঝেম, বেলাল হোসেন, মামুন মৃধা, রতন শিকদার, লিটন মুনশী, হাসিনা মমতাজ রিনা, সুফিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা). মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম, জাহেদ আলী, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন এবং ইসাহাক মিয়া।
অভিযোগ আছে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই হত্যাকান্ডের প্রতিকারের ব্যাপারে তৎকালীন বিএনপি সরকার নিলিপ্ত ভ’মিকা পালন করেছিল। শুধু তাই নয় এ হামলার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে সরকারের কর্মকর্তারা ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত পাঁচটি গ্রেনেড ধ্বংস করে দিয়ে প্রমান নষ্ট করার চেষ্টাও করা হয়েছিল।
পরবর্তি সময়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুরজ্জামান বাবর ঘটনার সাথে তারেক রহমান জড়িত আছেন বলে দাবি করে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাধর বড় পুত্র তারেক রহমান ‘এ হামলার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছিলেন।’
সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুকুল পরিস্থিতিতে সরকার এ হামলার পুনারায় তদন্তের নির্দেশ দিলে এবং সাড়ে তিন বছর পর বিলম্বিত পুলিশ চার্জ শিট নথিভুক্ত করা হয়। অথচ বিএনপি’র কতিপয় সংসদ সদস্য এই জঘণ্য হামলাকে আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করেছিলেন।
পুনরায় তদন্তে পুলিশ এই হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে চিহ্নিত করে। এর আগে বেশ কয়েকটি বিদেশী মিশন যেমন ব্রিটিশ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, ইউএস ফেডারেল ব্যুারো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ইন্টারপোল বাংলাদেশী তদন্তকারীদের যোগ দিলেও এসব প্রতিষ্ঠান বিএনপি সরকার তাদের সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ করেছিল।
একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের আদেশ দিয়ে গত বছরের ১০ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত।
এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানীর অপেক্ষায় আছে। বর্তমানে শুনানীর জন্য পেপারবুক তৈরীর কাজ চলছে।