বাজিস-৭ : বৈদ্যনাথতলা থেকে মুজিবনগর

90

বাজিস-৭
মুৃজিবনগর
বৈদ্যনাথতলা থেকে মুজিবনগর
মেহেরপুর, ১৫ এপ্রিল, ২০১৯ (বাসস) : ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলায় ৩ বৈশাখ ১৩৭৮ সাল শনিবার বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ ঘোষণা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের জন্মলগ্নের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রীসভার অন্য মšী¿রাও শপথ গ্রহণ করেন তৎকালীন বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননে শপথ নিয়ে স্থানটিকে পূণ্যভূমিতে পরিণত করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম প্রধান সংগঠক ও নবগটিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারত গমনের সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রণাঙ্গনের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ এলাকার নিরাপত্তা ও ভৌগলিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। প্রথম দিকে চুয়াডাঙ্গায় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শপথ গ্রহণের স্থান চুয়াডাঙ্গার পরিবর্তে ইপিয়ার-উইংর অধীনে মেহেরপুর সীমান্ত এলাকা বৈদ্যনাথতলাকে নির্ধারণ করা হয়। পরেরদিন মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ যুদ্ধের ¯ী^ীকৃতি না পেয়ে যখন তাদের মনোবল ভাঙতে শুরু করে ঠিক এমনই এক সংকটময় মুহূর্তে ভারতীয় বি এসএফ এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলক মজুমদার ও ৭৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক তৌফিক-ই-এলাহি সহ আওয়ামীলীগ নের্তৃবৃন্দের সাথে কথা বলে বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ) জায়গা দেখিয়ে মঞ্চ তৈরির প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলেন।
আপামর জনতা স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে ১৬ এপ্রিল সকাল থেকে সারারাত ধরে মঞ্চ তৈরি বাঁশের বাতা দিয়ে বেস্টনি নির্মাণ এবং স্থায়ীভাবে ভাঙ্গা চেয়ার টেবিল দিয়েই আয়োজন সম্পন্ন করে। আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম আসে ভারতের হৃদয়পুর বিএসএফ ক্যাম্প থেকে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম অন্য নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সকাল ৯ টার দিকে বৈদ্যনাথতলায় পৌঁছেন। দেশি বিদেশী শতাধিত সাংবাদিক এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও আসেন। তার মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক ট্যালি ও পিটার হেস।
বহু প্রতীক্ষিত শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা ১১ টায়। মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দীন আহমেদ স্থানীয় ১২জন ইপিআর আনসার-এর একটি ছোট দল নিয়ে নেতৃবৃন্দকে অভিবাদন জানান। অভিবাদন গ্রহণের পর স্থানীয় শিল্পীদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। গৌরী নগরের বাকের আলীর কোরআন তেলাওয়াত এবং ভবের পাড়া গ্রামের পিন্টু বিশ্বাসের বাইবেল পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠনিক কার্যক্রম। এরপর আওয়ামী লীগের চিফহুইফ অধ্যাপক মোঃ ইউসুফ আলী বাংলার মুক্ত মাটিতে স্বাধীনতাকামী কয়েক হাজার জনতা এবং শতাধিক দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের সামনে দাঁড়িয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্র প্রধান হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয় এবং প্রধানমšী¿ তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে পরামর্শ ক্রমে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, আইন সংসদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খন্দকার মোশতাক আহমদ. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে এ এইচ কামরুজ্জামান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং শপথ পাঠ করেন। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেই কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এরপর তাজউদ্দীন আহমদ ৩০ মিনিট ভাষণ দেন এবং বৈদ্যনাথতলাকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করেন। তিনি বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিদান ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান। সেই দিন থেকেই বৈদ্যনাথতলা মুজিবনগর নামে পরিচিত হয়। বক্তৃতা ও শপথ গ্রহণ পর্ব শেষে নেতৃবৃন্দ মঞ্চ থেকে নেমে এলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। উপস্থিত জনতার মূহুর্মূহু জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মুজিবনগরের আম্রকানন। সব মিলিয়ে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
বাসস/সংবাদাতা/১৮১০/-মরপা